চা-বাগান আর সবুজ পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর শ্রীমঙ্গল এবার নতুন করে আলোচনায় মসলা জাতীয় ফসল মৌরি চাষে সাফল্যের কারণে। সুগন্ধি এই ভেষজ-মসলার বাণিজ্যিক আবাদে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। অনুকূল পরিবেশ, মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ুর কারণে স্বল্প খরচে ভালো ফলন পাওয়ার আশায় মৌরি এখন হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় লাভজনক ফসল।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, সরিষা ও সবজি চাষের পাশাপাশি অনেক কৃষক এখন মৌরি চাষে ঝুঁকছেন। মাঠজুড়ে সবুজ গাছের সমারোহ, আর বাতাসে ভেসে আসা মিষ্টি ঘ্রাণ-সব মিলিয়ে এক নতুন সম্ভাবনার ছবি ফুটে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, “মসলার উন্নতজাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প”-এর আওতায় ১০ শতক করে মোট ৮০ শতক জমিতে ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। চাষিদের প্রণোদনা হিসেবে উন্নতমানের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। এর আগে দুই ব্যাচে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, যাতে তারা আধুনিক পদ্ধতিতে মৌরি চাষে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সূত্রধর জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার জমিতে মৌরির আবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে ফসল মাঠে ভালো অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১.১ থেকে ১.৩ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৌরি, যা মিষ্টি মৌরি, মহুরি বা গুয়োমুরি নামেও পরিচিত। প্রাচীনকাল থেকেই রান্নার মসলা ও ভেষজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পঞ্চফোড়ন, আচার কিংবা পানের সঙ্গে মৌরির ব্যবহার আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। হজমে সহায়ক হিসেবে এর জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত।
পুষ্টিগুণেও মৌরি সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে কপার, আয়রন, পটাসিয়াম, জিংক ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’, ‘ই’ ও ‘বি’ বিদ্যমান থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এর চাহিদা বাড়ছে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, মৌরি শরীর শীতল রাখতে সহায়ক এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করে। কোষ্ঠকাঠিন্য, অগ্নিমন্দ্য, কৃমি, কাশি ও বমি প্রতিরোধে এটি কার্যকর বলে মনে করা হয়। এছাড়া রক্তপিত্ত, জ্বরসহ বিভিন্ন উপসর্গ উপশমে মৌরির ব্যবহার রয়েছে গ্রামীণ চিকিৎসায়।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, স্বল্প খরচে চাষ করা যায় এবং বাজারে চাহিদাও ভালো। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মৌরি হতে পারে শ্রীমঙ্গলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সংযোজন।
চা শিল্পনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ বাড়লে ফসল বৈচিত্র্যকরণে গতি আসবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে বহুগুণে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মৌরি উৎপাদনে শ্রীমঙ্গল একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে দেশের মানচিত্রে নতুন পরিচয় গড়ে তুলবে-এমনটাই প্রত্যাশা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয়দের।
মন্তব্য করুন