ঋতুরাজ বসন্তের পদচারণায় রঙে রঙে সেজে উঠেছে চায়ের দেশ মৌলভীবাজার। সবুজের বুক চিরে জ্বলে উঠেছে আগুনরাঙা পলাশ-যেন প্রকৃতির নিজস্ব প্রদীপ প্রজ্জ্বলন। মাঠের ধারে, বনপথে, উপজেলা পরিষদ চত্বরে কিংবা সরকারি দপ্তরের আঙিনায়-যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই লাল শিখার দ্যুতি।

বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পলাশের এই দৃষ্টিনন্দন উপস্থিতি যেন বসন্তকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বর ও মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ অফিস প্রাঙ্গণে ফুটে থাকা পলাশ গাছ পথচারীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করছে। কেউ মুঠোফোনে বন্দি করছেন রঙের উচ্ছ্বাস, কেউবা সেলফিতে ধরে রাখছেন স্মৃতির ফ্রেমে।

দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের ভাঁজে ভাঁজে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে আছে। পাতাহীন ডালে গুচ্ছ গুচ্ছ টকটকে লাল পলাশ যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। ফুল ফোটার সময় গাছ প্রায় সম্পূর্ণ পাতাশূন্য থাকে-এতেই তার রূপ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

বাংলা ফাল্গুন ও চৈত্র মাস-ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শুরুর এই সময়টাতেই পলাশের রাজত্ব। বসন্তের বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়, তার অন্যতম প্রতীক এই পলাশ। রঙের তীব্রতায় একে অনেকে বলেন-‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’। শুধু সৌন্দর্য নয়, পলাশ আমাদের সংস্কৃতিরও অংশ। বসন্ত উৎসব, কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহ্যে পলাশের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। এই ফুল মনে জাগায় ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস আর নতুন শুরুর স্বপ্ন।

তবে প্রকৃতিপ্রেমীরা বলছেন, দেশে পলাশ গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বনভূমি সংকোচন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দেশীয় এই গাছটি আগের মতো আর চোখে পড়ে না। তাই পরিবেশবিদদের আহ্বান-দেশীয় বৃক্ষ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং বেশি করে পলাশসহ দেশীয় ফুলগাছ রোপণ করতে হবে।

কারণ পলাশ শুধু বসন্তের অলংকার নয়; এটি আমাদের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন মৌলভীবাজারের পথে হাঁটলেই চোখে পড়ে রঙের উল্লাস। লাল পলাশের দোলায় দুলে ওঠে মন, জেগে ওঠে নতুন দিনের প্রত্যাশা। বসন্ত যেন আবারও জানিয়ে দেয়-প্রকৃতি তার নিজস্ব ছন্দে অনন্ত নবজাগরণের গল্প লিখেই চলে।