রমজান মাস এলেই ইফতারের টেবিলে ফলের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। আর সেই তালিকায় অন্যতম জনপ্রিয় ফল হচ্ছে শ্রীমঙ্গলের সুস্বাদু আনারস। রসে ভরপুর, সুগন্ধি ও স্বাদে অনন্য হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রীমঙ্গলের আনারসের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। চলতি রমজানেও আনারসের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে, আর উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহও রয়েছে পর্যাপ্ত। ফলে কৃষক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা-সবাই সন্তুষ্ট।

আনারস একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হওয়ার পাশাপাশি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। বাংলাদেশে শ্রীমঙ্গল, সিলেট, মৌলভীবাজার, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আনারসের ব্যাপক চাষ হলেও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের আনারসের স্বাদ ও মানের কারণে দেশব্যাপী বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিষামণি, মাইজদিহি, হোসেনাবাদ, এমআর খান, নন্দরানী, বালিশিরা, নূরজাহান, ডলুছড়া, সাতগাঁও ও মোহাজেরাবাদসহ প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও পাহাড়ি টিলা এলাকায় ব্যাপকভাবে আনারস চাষ হয়। উঁচু-নিচু টিলাভূমি, অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটি আনারস উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এখানকার ফলের স্বাদ ও গুণগত মান অন্য অঞ্চলের তুলনায় উন্নত।

ভর মৌসুমে প্রতিদিন ভোর থেকে শত শত ঠেলাগাড়ি ও ছোট যানবাহনে করে আনারস এসে জমা হয় শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন বাজারে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে এসব আনারস ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান উপলক্ষে পাইকারি বাজারে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সারাবছর উৎপাদন, রমজানে বাড়তি চাহিদা একসময় মৌসুমি ফল হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে শ্রীমঙ্গলে প্রায় সারা বছরই কম-বেশি আনারস উৎপাদিত হচ্ছে। তবে রমজান মাসে এর চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এবছর আগাম ফলন হওয়ায় রোজার শুরু থেকেই বাজারে পর্যাপ্ত আনারস এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সরবরাহ ভালো থাকায় পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বেচাকেনা জমজমাট। দামও তুলনামূলকভাবে ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।

শ্রীমঙ্গল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সূত্রধর জানান, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৪২৫ হেক্টর জমিতে হানিকুইন, জায়েন্ট কিউ ও ক্যালেন্ডার জাতের আনারস চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে হানিকুইন জাত সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বেশি চাষ হয়। এ জাতের আনারস দেখতে আকর্ষণীয়, আকারে মাঝারি এবং স্বাদে অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বেশী।

তিনি বলেন, “চাষিরা সময়মতো সেচ ও আন্তঃপরিচর্যা করায় এবার ফলন ভালো হয়েছে এবং আনারস আগাম বাজারে এসেছে। পবিত্র রমজান মাসে বাজারজাত করতে পারায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।”

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়। হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন প্রায় ১৬ মেট্রিক টন। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা।

শ্রীমঙ্গলের বিষামনি গ্রামের সফল আনারস চাষি আতর আলী জানান, ৩৫ বিঘা জমির অর্ধেকে প্রায় ৭০ হাজার আনারস গাছ লাগিয়েছেন। বছরে পরিচর্যায় প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হলেও সব ব্যয় বাদ দিয়ে তার লাভ বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। ইতোমধ্যে তিনি কৃষি বিভাগ থেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কৃষি পুরস্কারও পেয়েছেন। তার উচুঁ-নিচুঁ পাহাড়ি টিলায় আনারস ছাড়াও লেবু, কফি, ক্যাপসিকাম, লটকনসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল-ফলাদি চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন।

স্থানীয় কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা জানান, শ্রীমঙ্গলে একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে আনারসভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প-যেমন জ্যাম, জুস, জেলি ও টিনজাত খাদ্য শিল্প-গড়ে উঠলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও প্রক্রিয়াজাত আনারসজাত পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে শ্রীমঙ্গলের আনারস শুধু মৌসুমি ফল হিসেবেই নয়, বরং দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী পণ্যে পরিণত হতে পারে। রমজানের বাজারে আনারসের বাড়তি চাহিদা ও ভালো দাম কৃষকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথ অবকাঠামো ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে শ্রীমঙ্গলের আনারস শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক খাতে রূপ নিতে পারে। পেতে পারে জি আই পণ্যের মর্যাদা।