চায়ের শহর শ্রীমঙ্গলে এখন প্রকৃতির নতুন রূপ। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দিগন্তভরা হলুদ সূর্যমুখী ফুল যেন বসন্তের রঙিন বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। সূর্যের দিকে মুখ তুলে থাকা হাজারো সূর্যমুখী ফুলে ভরে গেছে উপজেলার বাগান ও কৃষিজমি। নয়নাভিরাম এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ, আর সম্ভাব্য ভালো ফলনের আশায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
অল্প খরচে অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকায় সূর্যমুখী এখন শ্রীমঙ্গলের কৃষকদের কাছে একটি সম্ভাবনাময় তেল ফসল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। কৃষি বিভাগের প্রণোদনা ও কারিগরি সহায়তায় ধীরে ধীরে বাড়ছে এর আবাদ। চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী বাগানগুলোতে ইতোমধ্যে ফুল ফুটেছে, যা ভালো ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সেলিম হোসেন জানান, সূর্যমুখী এক ধরনের একবর্ষী উদ্ভিদ, যার গাছ প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং ফুলের ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সূর্যের মতো দেখতে এবং সর্যের দিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকার বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর নাম সূর্যমুখী। এর বীজ থেকে উৎপাদিত তেল বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল হিসেবে পরিচিত।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সরকারিভাবে শ্রীমঙ্গলে প্রথম সূর্যমুখী চাষ শুরু হয়। সে সময় ৯ ইউনিয়নের ৩৭০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ, বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং ৫২ হেক্টর জমিতে এর আবাদ হয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে কৃষকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরেও প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা উজ্জ্বল সূত্রধর জানান, চলতি মৌসুমে সূর্যমুখী চাষের অগ্রগতি অত্যন্ত সন্তোষজনক। অধিকাংশ বাগানে গাছে ফুল এসেছে এবং গাছের বৃদ্ধি ভালো হওয়ায় সম্ভাব্য ফলন নিয়েও আশাবাদী কৃষি বিভাগ। সময়মতো বপন, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন এবং নিয়মিত কারিগরি পরামর্শের কারণে মাঠের ফসলের অবস্থা ভালো রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রণোদনা কর্মসূচির ফলে পতিত ও এক ফসলি জমি আবাদে আসছে এবং কৃষকদের মধ্যে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪৯৪ শতক জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকির কারণে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যমুখী তেল কোলেস্টেরল কম থাকায় হৃদরোগীদের জন্য উপকারী এবং এতে ভিটামিন এ, ডি ও ই থাকায় পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতেও সূর্যমুখী চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশে সূর্যমুখী তেল ফসল হিসেবে চাষ হয়ে আসছে। বর্তমানে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, দিনাজপুর, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় এর আবাদ বিস্তৃত হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের মাঠজুড়ে ফুটে থাকা সূর্যমুখী যেন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, কৃষকদের মনে জাগিয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বপ্নও।
মন্তব্য করুন