কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্য্যের নিদর্শন মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়ার জমিদার বাড়ি! এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন আমলের জমিদার বাড়ি ও মসজিদ। এই বাড়ির ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে অবস্থিত জমিদারবাড়ি। যা এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এক স্থান।

উপজেলার উত্তর উলানিয়ার ৯টি গ্রামের মধ্যে একটি গ্রামের নাম হলো উলানিয়া গ্রাম। উলানিয়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুবেদার হানিফ। পঞ্চদশ সালের গোড়ার কথা এই অঞ্চল ছিল মগ-পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমনে পর্যুদস্ত। এই মগ হার্ম্মাদদের প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ। অতঃপর এদের দমনের উদ্দেশে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব সুবেদার শায়েস্তা খানকে পাঠান। শায়েস্তা খান তার পুত্র উমেদ খান ও বিশাল রনতরী সৈন্য গোলাবারুদ নিয়ে জলদস্যু প্রতিহত করতে এগিয়ে আসেন। মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুরে কেল্লা তৈরী করা হল। স্থানীয়ভাবে যা সংগ্রাম কেল্লা নামে পরিচিত ছিল। এই অভিযানে মো. হানিফ নেতৃত্ব দিয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মগ-পর্তুগীজ-হার্ম্মাদরা বিতারীত হলেন। কিন্তু পারস্য বংশোদূত হানিফ খান এদেশে ভালোবেশে থেকে গেলেন। মো. হানিফের এক কন্যা সন্তান ছিল। মো. হানিফের ভ্রাতস্পুত্র ও জামাতা এবং উত্তরাধিকারী শেখ মো. হাবিজ পরবর্তিকালে সংগ্রাম কেল্লা থেকে সামান্য পশ্চিমে উলানিয়া অঞ্চলে এসে বসবাস করেন। মো. হাবিজের পুত্র শেখ মোঃ সদরুদ্দিনের আমলেই মূলত উলানিয়া জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ৩ পুত্র ছিল। এরা হলেন- নয়া রাজা চৌধুরী, কালা রাজা চৌধুরী ও হাসান রাজা চৌধুরী। তাদের সময়েই বসত বাড়িটিকে উঁচু প্রাচীর ঘেড়া দুর্গের মত করে নির্মাণ করা হয়। যতদূর জানা যায় উলানিয়া জমিদার বাড়ির তিন কামরা বেষ্টিত মূল ভবনটা শেখ হানিফের সময়েই নির্মিত। সামনে সু-বিশাল দিঘী, বাড়ির পিছনদিকে এবং পাশে বেশ কয়েকটা পুকুর, শানে বাঁধানো ঘাট। মূল বাড়ির পাশে কাচারি বাড়ির সামনে ডাকবাংলা মূল বাড়িতে ঢুকতে দ্বীতল প্রবেশ পথ। সবমিলিয়ে এই বাড়িটা ঘিরে এই অঞ্চলে প্রচলিত আছে নানান রকম কিংবদন্তী লোককথা। স্থাপনাটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষনের কাজ চলমান রয়েছে । জমিদার বাড়িটি সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন করতে পারলে এটিও হতে পারে দর্শনীয় স্থানের একটি। স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এই জমিদার বাড়ির মূল ফটকের সামনেই রয়েছে বিশাল আকারের একটি দৃষ্টিনন্দন পুকুর যার নাম মিয়া বাড়ির দিঘী।
, কালের বিবর্তনে জমিদার বাড়ির আগেকার অনেক স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এখনও বিদ্যমান রয়েছে জমিদার আমলের খননকৃত বিশাল আকৃতির পুকুর।

বাড়ির প্রধান ফটকের পাশেই নির্মাণ করা হয় একটি মসজিদ। এটিই মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটির বৈশিষ্ট: ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর মসজিদটি কয়েকবার সংস্কার করা হলেও মূল অবয়ব এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে। ৩ গম্বুজ বিশিষ্ঠ এই মসজিদটি অনেকটা তাজমহল আকৃতির। মসজিদের সামনে বাধানো চওরা, পুকুর রয়েছে। মূল গৃহের আগে লোহার ৬ খামের ওপর প্রতিষ্ঠিত জাফরির কাজ রয়েছে। এখানে বীমের ছাদ রয়েছে। মসজিদের তিনটি দরজা। মসজিদের ভিতরে একসাথে শতাধিক মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের আর একটি বৈশিষ্ট রয়েছে যা তাকে অন্য মসজিদের থেকে আলাদা করেছে। সেটি হলো মসজিদ গাত্রে শিলালিপি। এই মসজিদ গাত্রের পুরোনো শিলালিপীটি এখন আর নেই। তবে একই রকম শিলালিপী উৎকীর্ণ রয়েছে। মসজিদের বাহিরের গাত্রে চিনে মাটির টুকরা দিয়ে গড়া রয়েছে। মসজিদটি মূলত মোগলরীতিতে তৈরী। ভেতর ও বাহিরের গাত্রে জ্যামিতিক লতাপাতা ও ফলের নকশা রয়েছে। প্রাচীন ঐতিহ্যের স্থাপনাটি দেখতে প্রতিনিয়ত দেশি-বিদেশি পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ভিড় করে। পুকুরের অদূরেই বহু পুরাতন স্থাপনা ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ। প্রায় ৩শ’ বছর আগে নির্মিত এটি। যা পরে সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের নিকটে জমিদার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান অবস্থিত। সেখানে চিরশায়িত আছেন এ অঞ্চলে জমিদার বাড়ির পূর্বপুরুষ মোহাম্মদ হানিফ।