জাতীয় সংসদের ১১৪, পটুয়াখালী-৪, (কলাপাড়া-মহিপুর-রাঙ্গাবালী) সংসদীয় আসনটি দুইটি থানা, দুইটি পৌরসভা, ১২টি ইউনিয়ন এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার রাঙ্গাবালী থানার অন্তর্গত ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। দক্ষিনের এ জনপদে আওয়ামীলীগ সরকার লক্ষ-কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলছে। এরমধ্যে কুয়াকাটা পর্যটন, পায়রা সমুদ্র বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবমেরিন ল্যান্ডিং ষ্টেশন, শের-ই-বাংলা নৌ-ঘাঁটি, ফোর লেন সড়ক, সিক্স লেন সড়ক, শেখ কামাল সেতু, শেখ জামাল সেতু, শেখ রাসেল সেতু, শহীদ নজরুল ইসলাম সেতু, টিয়াখালী সেতু, চাকামইয়া চীন-মৈত্রী সেতু দেশের উন্নয়ন ও সৃমদ্ধিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। প্রক্রিয়ানাধীন রয়েছে বুলেট ট্রেন, সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট, পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিমান বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প। এসকল মেগা প্রকল্প সম্পন্ন হলে মিনি সিঙ্গাপুর হবে এ নির্বাচনী এলাকা। দিন বদলের হাতছানিতে উন্নত, সমৃদ্ধ হবে উপকূলের মানুষের জীবন যাত্রা। এর সাথে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী, মুজিব শতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর এই জনপদে দরিদ্রদের স্বপ্ন পূরন করেছে।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, উপকূলের এ নির্বাচনী এলাকার মানুষ বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীককে স্বাধীনতার পর থেকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। বিএনপি শাসনামলেও নৌকা বিজয়ী হয়েছে এ নির্বাচনী এলাকায়। তবে স্বৈরাচার এরশাদ শাসনামলে নৌকা প্রেমীদের ভোটবাক্স ছিনিয়ে নিয়ে এমপি হন জাপা (এ) প্রার্থী। তবে বিএনপির দাবী উন্নয়নের নামে অসংখ্য মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব বাস্তচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থাই করেনি আওয়ামীলীগ সরকার। যা এ আসনটিতে আগামী নির্বাচনে ব্যপক প্রভাব বিস্তার করবে এবং মানুষের সাংবিধানিক অধিকার যেভাবে হরন করা হয়েছে তার ফল হিসাবে ভোটাররা বিএনপির পক্ষে ভোট দেবে।
সোমবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৪১ জন। এর মধ্যে কলাপাড়ায় এক লাখ ৯৯ হাজার ৪৫৫ জন। আর রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৮৮ হাজার ৮৮৬ জন। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৬৭ জন এবং মহিলা ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪ জন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ৯০ হাজার ৭৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এ আসনে। চারদলীয় জোটের বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন ৬০ হাজার ১২ ভোট। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে আওয়ামীলীগের প্রার্থী। ২০১৮ সালে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন অধ্যক্ষ মো. মহিব্বুর রহমান। বর্তমান এমপি অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মো: মহিব্বুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা, দেশরতœ শেখ হাসিনা আমাকে এ আসনের মানুষের খেদমত করার সুযোগ করে দিয়েছেন। মানুষের সঠিকভাবে সেবা দেয়ার জন্য সম্প্রতি আমি দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক মাদার তেরেসা এওয়ার্ড পেয়েছি, যা প্রধানমন্ত্রীকে উৎসর্গ করেছি। মহিব্বুর রহমান আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নে মাস্টারপ্লান বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল রাঙ্গাবালীতে নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌছে দেয়া হয়েছে। রাঙ্গাবালীতে জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, সরকারী বানিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নয়নের কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার। তিঁনি এমপি হওয়ার পর এ জনপদের সকল নদী, খাল, স্লুইজ, কালভার্ট কৃষকের জন্য উম্মুক্ত করেন। দলকে সুসংগঠিত করে দলের অস্বচ্ছল, অসুুস্থ নেতা-কর্মীদের পাশে দাড়িয়েছেন অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ করোনাকালে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, কখনও ভ্যানে কখনও ডিঙি নৌকায় চড়ে কাঁদা পানিতে নেমে দু:স্থ মানুষের বাড়ী বাড়ী তাঁর খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়া ছিল প্রশংসনীয়। প্রতি বছর দরিদ্র পরিবারের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরন, তাদের স্বাবলম্বী করতে অর্থের যোগান দেন তিঁনি। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ স্বাস্থ্য সেবায় হাসপাতাল স্থাপন করেছে তাঁর পরিবার। তিঁনি লিফলেট বিতরন করে সরকারের চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ড এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রচারনা শুরু করেছেন এক বছর আগ থেকে। এতে দল, সাধারন মানুষ এবং তৃনমূল নেতা-কর্মীদের আস্থা তার উপরই বলে তিন জানান। দল থেকে আমি মনোনয়ন পেলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো ইনশাআল্লাহ।
আওয়ামীলীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান। অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন তিঁনি। নবম সংসদের পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর এলাকায় নিজ অনুসারী, দলের অভ্যন্তরে হাইব্রীডের অনুপ্রবেশ, গঙ্গামতি নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান খোলা, এক ডজন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, রাতারাতি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হন তিঁনি। বিষয়টি গনমাধ্যমে উঠে এলে দুদক তার ও তাঁর স্ত্রী প্রীতি হায়দার উভয়ের নামে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুইটি মামলা করে ঢাকার রমনা থানায়। এরপর দুজনকেই অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করে দুদক। অত:পর ঢাকা বিভাগীর স্পেশাল জজ আদালত ০৮/২০১৫ মামলায় অভিযোগ গঠন করে তার বিরুদ্ধে এবং ১০/২০১৬ মামলায় অভিযোগ গঠন করে প্রীতি হায়দারের বিরুদ্ধে। এতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন বঞ্চিত হন মাহবুবুর রহমান তালুকদার।
এছাড়াও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে রাতের ভোট বলে তাঁর বেফাঁস মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিব্রত অবস্থায় পড়ে দল। তাঁকে দল থেকে বহিস্কারের সুপারিশ করা হয় কেন্দ্রে। তবে এ আসন থেকে এবার আওয়ামীলীগের মনোনয়ন চান সাবেক এনএসআই, সাবেক এসএসএফ পরিচালক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মো. হাবিবুর রহমান মিলন। তিঁনি বলেন, জন্মগত ভাবে আমি আওয়ামীলীগ পরিবারের সদস্য। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে অত্যন্ত সততার সাথে পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং একজন ভালো সংসদ সদস্য হওয়ার সম্ভাবনার কারনেই এবার নমিনেশন প্রত্যাশা করছি। আমি এমপি হলে আমার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করবো।
এছাড়াও এ আসন থেকে এবার আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী আরো আছেন জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ সৈয়দ নাসির উদ্দিন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামীলীগের নেতা আলাউদ্দীন আহমেদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক নীহার রঞ্জন সরকার মিল্টন, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আনোয়ার-উল-ইসলামের পুত্র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কিমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক আবদুল্লাহ-আল-ইসলাম লিটন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আল সাইফুল সোহাগ, সাবেক ছাত্র নেতা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি মুরসালিন আহম্মেদ প্রমূখ।
অপরদিকে এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব এবিএম মোশাররফ হোসেন। নির্বাচনকে টার্গেট করে এ আসনে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের তৃনমূল কাউন্সিলে সকল ইউনিটের নতুন কমিটি গঠনে বিএনপি এখানে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ। বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেন জানান, নির্বাচন মানে জনগনের রায়, যা ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী সরকারের অধীনে ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। বিএনপি মনে করে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব না। তাই বিএনপির স্পষ্ট ঘোষনা কোন দলীয় সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাবে না বিএনপি।
এ বি এম মোশাররফ আরো বলেন, আমরা মনে করি ১১৪, পটুয়াখালী-৪, কলাপাড়া আসনটিতে উন্নয়নের নামে অসংখ্য মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব বাস্তচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থাই করেনি আওয়ামীলীগ সরকার। যা এ আসনটিতে আগামী নির্বাচনে ব্যপক প্রভাব বিস্তার করবে এবং মানুষের সাংবিধানিক অধিকার যেভাবে হরন করা হয়েছে তার ফল হিসাবে ভোটাররা বিএনপির পক্ষে ভোট দেবে। তবে আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়নে এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ফের বিজয়ী হবেন, এমনটাই বলছেন ভোটাররা।
তবে বিএনপিও জয়ী হতে চায় এ আসন থেকে। বিএনপি নির্বাচনী মাঠে এলে এবিএম মোশাররফ হোসেনের সাথে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নৌকা প্রার্থীর, আর নির্বাচনে না এলে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাত পাখা প্রার্থী মুফতি হাবিবুর রহমান এই আসনে নৌকার প্রতিদ্বন্ধি হবেন। জাসদ (ইনু) থেকে সাংবাদিক বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু এ আসন থেকে ১৪ দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। জাপা (এ) থেকে মনোনীত প্রার্থী বা তাদের কর্মী সমর্থকের আপাতত দৃষ্টিতে কোন সরগরম এখানে নেই বললেই চলে ।
মন্তব্য করুন