রঙ বদলানো ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য..

প্রকাশ: 14 October 2026 । 13:49 | আপডেট: 14 October 2026 । 13:49

আতাউর রহমান কাজল “ ব্যুরো চীফ, সিলেট”

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন স্থলপদ্ম। নামের সঙ্গে পদ্ম শব্দটি থাকলেও জলাশয়ে নয়, মাটিতেই বেড়ে ওঠে এই দৃষ্টিনন্দন ফুলের গাছ। শরৎ ও হেমন্তের স্নিগ্ধ আবহে গাছে গাছে ফুটে ওঠা স্থলপদ্ম তার রূপ, কোমলতা ও রঙের বৈচিত্র্যে প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।

ফুলটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো দিনের বিভিন্ন সময়ে এর রঙে পরিবর্তন দেখা যায়। সকালে সাদা বা হালকা গোলাপি রঙের ফুল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে গাঢ় গোলাপি কিংবা লালচে আভা ধারণ করে। একই গাছে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ফুলের উপস্থিতি যেন প্রকৃতির তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি। বাগানের আঙিনা, বাড়ির উঠান কিংবা রাস্তার পাশের সবুজ পরিবেশে স্থলপদ্মের উপস্থিতি সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফুলের সৌন্দর্য, পাতার গঠন এবং ঝোপালো গাছের সবুজ আচ্ছাদন মিলিয়ে স্থলপদ্ম হয়ে উঠতে পারে বাড়ির বাগানের অন্যতম আকর্ষণ। বুধবার সকাল ১১ টার দিকে শহরের ফরেস্ট অফিস রোডের কল্লোল দেবের বাসার ছাদে গিয়ে দেখা যায, টবে দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক সৌন্দর্য্যরে স্থলপদ্ম ফুটে রয়েছে। ছবিগুলো সেখান থেকেই ধারন করা হয়।

স্থলপদ্মের বৈজ্ঞানিক নাম Hibiscus mutabilis । এটি মালভেসি (Malvaceae) পরিবারের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। একই পরিবারের পরিচিত উদ্ভিদ জবা ও ঢেঁড়সের সঙ্গে স্থলপদ্মেরও উদ্ভিদতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। ইংরেজিতে ফুলটি ‘চেঞ্জেবল রোজ’ (Changeable Rose), ‘কনফেডারেট রোজ’ (Confederate Rose) এবং ‘কটন রোজ’ (Cotton Rose)  নামেও পরিচিত।

নামের সঙ্গে পদ্মের মিল থাকলেও প্রকৃত পদ্মের সঙ্গে স্থলপদ্মের উদ্ভিদতাত্ত্বিক কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই। প্রকৃত পদ্ম জলজ উদ্ভিদ, আর স্থলপদ্ম মাটিতে জন্মানো একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ফুলের সৌন্দর্য ও রঙের পরিবর্তনশীলতার কারণে স্থলপদ্মের এই স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে উঠেছে।

স্থলপদ্মের আদি নিবাস চীন ও এশিয়ার আশপাশের অঞ্চল বলে বিবেচিত। বর্তমানে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষ হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও গাছটি ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। বাড়ির আঙিনা, বাগান ও উপযুক্ত আকারের টবে এটি লাগানো যায়। ফুলের রঙে রঙে বদলে যায় প্রকৃতি স্থলপদ্মের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ফুল। দেখতে অনেকটা জবার ফুলের মতো হলেও স্থলপদ্মের ফুল সাধারণত আকারে বড় এবং পাপড়ির বিন্যাসে বেশ বৈচিত্র্যময়। ফুলের রং সাদা, হালকা গোলাপি কিংবা গাঢ় গোলাপি হতে পারে। কিছু ফুলে দুধে-আলতা মেশানো রঙের কোমল আভাও দেখা যায়।

ফুলের রং পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্যই স্থলপদ্মকে অন্য অনেক ফুলের চেয়ে আলাদা করেছে। ফুল ফোটার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পাপড়ির রং বদলাতে থাকে। সকালের তুলনায় বেলা বাড়ার পর ফুলের রং আরও গাঢ় হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই ইংরেজি ‘চেঞ্জেবল রোজ’ নামটি ফুলটির সঙ্গে বিশেষভাবে মানানসই।

সাধারণত শরৎ থেকে হেমন্ত এবং শীতের শুরুর দিকে স্থলপদ্মে বেশি ফুল দেখা যায়। আবহাওয়া ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে অন্য সময়েও ফুল ফুটতে পারে। ডালের আগায় একাধিক ফুল ফুটলে পুরো গাছটি যেন রঙিন ফুলের মুকুট পরে। সবুজ পাতার ফাঁকে সাদা ও গোলাপি ফুলের সমাহার বাগানের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। গাছের গঠনেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। স্থলপদ্ম একটি মাঝারি আকারের ঝোপালো গুল্ম। অনুকূল পরিবেশে গাছটি সাধারণত তিন থেকে চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর কা- কিছুটা খসখসে ও রোমশ। বড় বড় পাতার কিনারে কয়েকটি খাঁজ থাকে। পাতার গঠন অনেকটা ঢেঁড়সপাতার মতো হলেও স্পর্শে তা তুলনামূলক নরম।

গাছটি বছরে একবার পাতা ঝরাতে পারে। উপযুক্ত পরিচর্যায় নতুন ডালপালা গজায় এবং মৌসুমে ফুলে ভরে ওঠে। তবে দীর্ঘ ডালপালা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে গেলে গাছের আকৃতি কিছুটা এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। তাই গাছকে ঝোপালো ও দৃষ্টিনন্দন রাখতে নিয়মিত ছাঁটাই করা প্রয়োজন। সহজ পরিচর্যায় বাড়ির বাগানে স্থলপদ্ম স্থলপদ্ম চাষের জন্য খুব বেশি জটিল পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত মাটি এবং নিয়মিত যত্ন পেলে গাছটি ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। সরাসরি রোদে যেমন এটি জন্মাতে পারে, তেমনি আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানেও উপযুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।

স্থলপদ্মের বংশবিস্তারের সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো ডাল বা শাখা থেকে কাটিং তৈরি করা। সুস্থ ডাল থেকে কাটিং নিয়ে উপযুক্ত মাটিতে লাগালে নতুন গাছ জন্মাতে পারে। বীজ থেকেও চারা উৎপাদন করা যায়। তবে বীজের গাছের তুলনায় কাটিং থেকে তৈরি গাছে অপেক্ষাকৃত দ্রুত ফুল আসতে পারে। পরিচর্যা ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে কাটিংয়ের গাছে প্রায় এক বছরের মধ্যে ফুল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বাড়ির উঠানে সরাসরি মাটিতে লাগানোর পাশাপাশি বড় টবেও স্থলপদ্ম চাষ করা যায়। টবের আকার এমন হওয়া উচিত, যাতে শিকড় বিস্তারের পর্যাপ্ত জায়গা থাকে। টবের তলায় পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকা জরুরি। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে। গাছের আকৃতি সুন্দর রাখতে শীতকালে প্রয়োজন অনুযায়ী ডালপালা ছেঁটে দেওয়া যায়। এতে নতুন ডাল গজানোর সুযোগ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে গাছকে আরও ঝোপালো করে তোলা সম্ভব হয়। তবে ছাঁটাইয়ের সময় গাছের স্বাস্থ্য ও ফুল আসার মৌসুম বিবেচনায় রাখা ভালো।

প্রকৃতির রূপে স্থলপদ্মের আলাদা আবেদন ফুল মানুষের মনকে আনন্দ দেয়, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বাড়ায় এবং চারপাশের পরিবেশকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। স্থলপদ্ম সেই সৌন্দর্যেরই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এর রঙের পরিবর্তন, কোমল পাপড়ি, বড় সবুজ পাতা এবং ঝোপালো গাছ সব মিলিয়ে ফুলটি প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। আমাদের বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের সবুজ পরিবেশে এমন দেশ-বিদেশের পরিচিত শোভাবর্ধক গাছের চাষ বাড়ানো গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মও গাছপালা, ফুল ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে।

নামের মধ্যে পদ্ম থাকলেও জলাশয়ের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই, সেই স্থলপদ্ম মাটির বুকেই ছড়িয়ে দেয় রঙের মায়া। সকালে এক রূপ, বেলা বাড়লে অন্য রং প্রকৃতির এই নীরব রূপান্তরই স্থলপদ্মকে করে তুলেছে অনন্য। শরৎ-হেমন্তের স্নিগ্ধ আলোয় ফুটে থাকা এই ফুল যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু তার রঙে নয়, পরিবর্তনের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রোমান চৌধুরী।

প্রকাশকঃ  সানজিদা রেজিন মুন্নি।

সম্পাদকঃ কামরুজ্জামান বাঁধন।

নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ জালাল উদ্দিন জুয়েল।

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৭২৬৩, ০১৭১২-৮৩১৪৪৭

মেইলঃ rhbnews247@gmail.com, CC: rhbnews.nd@gmail.com

ঢাকা অফিসঃ এ্যাড পার্ক, ওয়াজী কমপ্লেক্স (৯ম তলা), ৩১/সি, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা -১০০০.

error: Content is protected !!