সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকার তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর অধিকার ও নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আরও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।

ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে। দারিদ্র্য মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ, পুঁজি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান খালেদা জিয়া। উন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন এবং প্রযুক্তি ও সম্পদের প্রবাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের ওপর জোর দেন তিনি। নদীর পানিবণ্টন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকারকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।

প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের ওপর গুরুত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমাতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তথ্যপ্রবাহের বাধা দূর করা প্রয়োজন।

পরিবেশ সুরক্ষার প্রসঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের পাটশিল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কৃত্রিম তন্তুর বিস্তারের কারণে পাটশিল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার ওপর তৈরি হওয়া চাপের কথাও জানান।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন খালেদা জিয়া। বৈষম্যমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা দূর করা, উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রসঙ্গে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন খাতে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্কের গুরুত্ব তুলে ধরে তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানান খালেদা জিয়া। বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরেন। ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে কৃষি, নৌচলাচল, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সমস্যা সমাধানে ন্যায্য পানিবণ্টনের জন্য স্থায়ী চুক্তির আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রসঙ্গে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সহিংসতার নিন্দা জানান তিনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদানের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন খালেদা জিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের সমঅধিকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিও সমর্থন জানান তিনি।

ভাষণের শেষ পর্যায়ে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘে দেওয়া স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেবেন তিনি। তাঁর আগে জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।

তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয় উঠে আসবে বলে পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন।