জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার জসিম উদ্দিনের কলেজপড়ুয়া মেয়ে লামিয়া। বাবার কবর জিয়ারত শেষে নানাবাড়ি ফেরার পথে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন তিনি। দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে আত্মহননের পথ বেছে নেন এই কলেজছাত্রী।
শনিবার (২৬ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর শেখেরটেকের ৬ নম্বর রোডের ভাড়া বাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মর্মান্তিক এই ঘটনায় এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
রোববার সন্ধ্যায় লামিয়ার মরদেহ পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে পৌঁছে। এ সময় পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর শোক। রাতেই নামাজের জানাজা শেষে বাবা শহীদ জসিমের কবরের পাশেই দাফন করা হয় তাকে।

শহীদ কন্যার মৃত্যুর খবরে সকাল থেকেই বাড়িতে ভিড় করেন এলাকাবাসী। দাদা আবদুস সোবাহান বলেন, “শনিবার সকালে নাতনির সাথে কথা হয়েছিল। আন্দোলনে ছেলেকে হারালাম, এখন নাতনিও চলে গেল।”
জানা যায়, লামিয়া তার মা ও ছোট দুই ভাই-বোনের সঙ্গে রাজধানীর শেখেরটেকের ভাড়া বাসায় থাকতেন। শনিবার রাতে মা ছোট বোনকে নিয়ে পাশের একটি মাদরাসায় গেলে বাসায় একা থাকা লামিয়া গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
চাচা মনিরুল ইসলাম জানান, “লামিয়া কলেজের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আজ রোববার বিকেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। শনিবার মার্কেট থেকে কিছু কেনাকাটাও করেছিল। সেই লামিয়া বাড়িতে ফিরল, তবে লাশ হয়ে।”
লামিয়ার মামা মো. মাহবুব মৃধা বলেন, “দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন করে জানানো হয়, ভাগ্নি মারা গেছে। হাসপাতালে গিয়ে দেখি তার নিথর দেহ পড়ে আছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমার বোন স্বামী হারিয়েছিলেন। এখন মেয়েকেও হারালেন। আমরা কার কাছে বিচার চাইবো?”
পরিবারের সদস্যরা জানান, ধর্ষণের পর থেকে চরম মানসিক অস্থিরতা, অপমানবোধ এবং সামাজিক চাপের কারণে লামিয়া হতাশায় ভুগছিলেন। তাদের ধারণা, মানসিক যন্ত্রণাই তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে।
শহীদ কন্যার মৃত্যুর খবর পেয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ সংগঠনের একটি প্রতিনিধি দল দুমকিতে ছুটে আসে। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন এবং সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন।
এছাড়া, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, যুগ্ম সদস্য সচিব ফয়সাল মাহমুদ শান্ত এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব জাহিদ হাসানও শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ান।
জানাজার আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, “জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদ জসিম উদ্দিন জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে বুলেটের সামনে বুক চেপে শহীদ হয়েছিলেন। সেই শোক কাটতে না কাটতেই তার পরিবারে আরেকটি শোকাবহ ঘটনা ঘটলো। ধর্ষণের বিচার দ্রুত হলে হয়তো লামিয়াকে আজ জীবন দিতে হতো না।”
এনসিপির নেতা সারজিস আলম বলেন, “এসব নরপিশাচদের মৃত্যুদণ্ড দেখতে চাই। মৃত্যুদণ্ডের ভিডিও ধারণ করে তা জনসমক্ষে প্রচারের ব্যবস্থাও করতে হবে।”
রাত ৮টার দিকে বাড়ির পাশে মাঠে লামিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপি ও এনসিপির নেতৃবৃন্দসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে বাবার কবরের পাশেই লামিয়াকে দাফন করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ১৮ মার্চ পটুয়াখালীর পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নে বাবার কবর জিয়ারত করে নানাবাড়ি ফেরার পথে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন লামিয়া। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় তাকে।
এই ঘটনায় ২০ মার্চ দুমকি থানায় মামলা করেন লামিয়া। মামলার পরপরই পুলিশ আসামি সিফাত মুন্সি (২০) ও পরদিন গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় সাকিব (১৯) কে গ্রেফতার করে।
দুমকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আলামত পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে তারা পটুয়াখালী কারাগারে আটক রয়েছেন।
মন্তব্য করুন