তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করার অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কম্পানিটি কয়েকবার আদালতে হেরেছে।
তবে আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া নতুন একটি জুরি ট্রায়াল মেটার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে এই মামলা করে। এতে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষায় ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
পাশাপাশি ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনারও দাবি জানিয়েছে তারা।এর মধ্যে রয়েছে ‘লাইক’ সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা এবং ব্যবহারকারীরা যাতে অবিরাম স্ক্রল করতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করা।
তরুণদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের বিভিন্ন ফিচার ও কার্যপ্রণালীতেও পরিবর্তন চায় অঙ্গরাজ্যগুলো। মামলায় মেটা হেরে গেলে তরুণদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহারের পদ্ধতিতে কম্পানিটিকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এক, কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য অভিভাবকের যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালু করা। দুই, ব্যবহারকারীদের বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখে এমন ‘ডোপামিন-প্রভাবকারী’ সুপারিশ অ্যালগরিদম পরিবর্তন করা। তিন, ছবিতে চেহারা পরিবর্তন করে এমন অনেক ইমেজ ফিল্টার সরিয়ে ফেলা। চার, ভিডিও কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়া বন্ধ করা। পাঁচ, একজন ব্যবহারকারী যাতে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা করা এবং ছয়, ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজের মতো নির্দিষ্ট সময় পর অদৃশ্য হয়ে যায় এমন পোস্ট বন্ধ করা।
এসব ফিচার বর্তমানে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, মেটা এমনভাবে এসব ফিচার তৈরি করেছে, যাতে কিশোর-কিশোরী ও শিশুসহ ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে থাকেন। তরুণদের বারবার অ্যাপে ফিরিয়ে আনতে মেটা ঘন ঘন নোটিফিকেশনও পাঠায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া তরুণদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আরো অভিযোগ, শিশুদের লক্ষ্য করে মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ধরে রাখতে চেয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করাই কম্পানিটির উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমানে শেয়ারবাজারে মেটার মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে মেটা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
কম্পানিটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এসব অভিযোগের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে একমত নই। প্রমাণ হবে যে, তরুণদের সহায়তা করার জন্য মেটা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।’
অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের অভিযোগ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান ফেডারেল বিচারক ইয়ভন গনজালেজ রজার্সের আদালতে উপস্থাপন করছে। তিনি ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের আলোচিত মামলারও বিচারক ছিলেন। প্রায় ২০ বছরের বিচারিক জীবনে কঠোর ও সরাসরি প্রশ্ন করার জন্য তার পরিচিতি রয়েছে।
এর আগে মেটার বিরুদ্ধে দেওয়া এক রায়ে নিউ মেক্সিকোর এক বিচারক কম্পানিটিকে মোট ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা করেন। একই সঙ্গে, অন্যান্য অঙ্গরাজ্য এখন যে ধরনের পরিবর্তন দাবি করছে, তার সঙ্গে মিল রয়েছে, এমন কিছু পরিবর্তন মেটার প্ল্যাটফর্মে আনারও নির্দেশ দেন তিনি।
বিচারক ব্রায়ান বিডশেইডও মেটার প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ‘লাইক’ সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা। পাশাপাশি, মেটার প্ল্যাটফর্মে কিশোর-কিশোরীদের নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণ বন্ধ করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া অ্যাপ থেকে পাঠানো পুশ নোটিফিকেশন দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড মেটাকে ‘জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মেটার কাজকে এমন একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা পরিবেশ দূষিত করে মানুষের ক্ষতি করে।
তবে মেটা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে জানিয়েছে। বিচারকের এই আদেশ শুধু নিউ মেক্সিকোতে কার্যকর হবে। তবে মেটার বিরুদ্ধে করা মামলায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য জয়ী হলে, পুরো যুক্তরাষ্ট্রেই একই ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে মেটাকে।
এই ৩০টি অঙ্গরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করেন। তাই এসব পরিবর্তন হলে দেশজুড়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ধরন অনেকটাই বদলে যেতে পারে।
বর্তমানে প্রায় সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই ‘লাইক’ একটি জনপ্রিয় ফিচার। লেখা, ছবি ও ভিডিওতে প্রতিক্রিয়া জানাতে মানুষ এটি ব্যবহার করেন। তবে ‘লাইক’ নিয়ে এখন সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের ওপর এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘লাইক’ সংখ্যার মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সম্পৃক্ততার সূচক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়া ও বিষণ্ণতার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
মেটার বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যগুলোর করা মামলায় কম্পানিটি ২০ লাখেরও বেশি নথি জমা দিয়েছে। এসব নথির মধ্যে মেটার নিজস্ব গবেষণাও রয়েছে। রাজ্যগুলোর আইনজীবীরা এসব গবেষণার কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘লাইক’ সংখ্যা মানুষের মধ্যে ‘সামাজিক তুলনা’ বাড়ায়। অর্থাৎ, অন্যের ছবি বা জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করে নিজের আত্মমর্যাদা বিচার করার প্রবণতা তৈরি হয়।
মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রামে এই সামাজিক তুলনা ‘একাকীত্ব বৃদ্ধি, নিজের শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং খারাপ মেজাজ বা নেতিবাচক অনুভূতির’ সঙ্গে যুক্ত।
বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড তার আদেশে বলেছেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, তা নিউ মেক্সিকোসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হওয়া ‘তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের’ একটি অংশ হয়ে উঠেছে। এই রায়ে প্রথমবারের মতো কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কম্পানিকে ‘জনসাধারণের ক্ষতিকর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন