বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে উঠেছে মৌলভীবাজার জেলায়। জেলার সদর উপজেলাসহ শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের পথে-প্রান্তরে এখন ফুটে উঠেছে শুভ্র সাদা বুনো ফুল ‘ভাঁট’। রাস্তার ধারে, পরিত্যক্ত ভিটেবাড়ি, ঝোপঝাড় এবং চা-বাগানের পাশজুড়ে এই ফুলের বিস্তার তৈরি করেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা সহজেই দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে পথচারী ও প্রকৃতি
অযত্নেই বেড়ে ওঠা এই বুনো ফুল সাধারণত অবহেলিত থাকলেও বসন্তে তার রূপ যেন নতুন করে ধরা দেয়। বিশেষ করে চা-বাগান সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ভাঁটগাছের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ ঝোপের ওপর যেন সাদা তুলোর আস্তরণ বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি।
ছোট আকারের পাঁচ পাপড়িবিশিষ্ট ফুলটির মাঝখানে থাকে লালচে আভা এবং দীর্ঘ পরাগদণ্ড, যা এর সৌন্দর্যে যোগ করে আলাদা মাত্রা। বিকেলের পর থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এর মৃদু সুবাস, যা গ্রামীণ পরিবেশকে করে তোলে আরও স্নিগ্ধ ও প্রাণবন্ত।
গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, চরাঞ্চল, পরিত্যক্ত মাঠ কিংবা জলাশয়ের ধারে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয় এই বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। গ্রামবাংলার পরিচিত এই ফুলটি অঞ্চলভেদে ভাইটা ফুল, ঘেঁটু ফুল, ভাত ফুল, বনজুঁই বা ঘণ্টাকর্ণ নামেও পরিচিত হলেও মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় এটি ‘ভাঁটফুল’ নামেই বেশি পরিচিত।
বসন্তের রঙিন আবহে যখন পলাশ ও শিমুল আগুনরাঙা রূপে প্রকৃতিকে সাজায়, তখন তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফাল্গুন ও চৈত্র মাসজুড়ে ফুটে ওঠে ভাঁটফুলের শুভ্রতা। গ্রামের পথ ধরে হাঁটলে দুই পাশের ভাঁটফুলের সারি দেখে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই যেন নিভৃত সৌন্দর্যের আয়োজন করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় সর্বত্র এই ফুলের দেখা মিললেও আবাদি জমি বৃদ্ধি ও বনজঙ্গল পরিষ্কারের কারণে ধীরে ধীরে কমে যায় এর বিস্তার। তবে চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন নির্জন এলাকায় ভাঁটফুলের ব্যাপক উপস্থিতি আবারও ফিরিয়ে এনেছে হারানো সৌন্দর্যের স্মৃতি।
বিকেলের দিকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমীরা এই শুভ্র ফুলের মাঝে ছবি তুলে সময় কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে বসন্তের এই বুনো সৌন্দর্যের দৃশ্য।
উদ্ভিদবিদদের মতে, ভাঁটফুল শুধু নান্দনিকতার প্রতীক নয়; এর রয়েছে ভেষজ গুণাগুণও। গ্রামীণ চিকিৎসায় এর পাতা ও শিকড় বিভিন্ন চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি মৌমাছির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ মধু উৎস হওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখে। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum viscosum, যার ইংরেজি নাম Hill Glory Bower Flower।
বসন্তের এই সময়টাতে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চাইলে মৌলভীবাজারের গ্রামীণ পথগুলো যেন নীরব আমন্ত্রণ জানায়— শুভ্র ভাঁটফুলের সৌন্দর্যে ডুবে যাওয়ার জন্য।
মন্তব্য করুন