সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন,পরিবেশ দূষণ নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ বাড়ছে। আমাদেরই নানা কর্মকাণ্ডে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, নষ্ট হচ্ছে ভারসাম্য। ফলে দিন দিন বিরূপ হয়ে উঠছে প্রকৃতি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, দাবানল, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তিত অবস্থা। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে। নষ্ট হচ্ছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ।
এছাড়া পরিবেশ দূষণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। সব মিলিয়ে আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। আমাদের জীবন তো ঝুঁকিতে রয়েছেই, আগামী প্রজন্মের জন্যও তা আরও খারাপ খবরই দিচ্ছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ ভালোভাবে গড়ে দেওয়ার জন্য আমরা কি আসলেই কিছু করছি বা অবদান রাখছি। এর উত্তর সম্ভবত ‘না’।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারাবিশ্বে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষ করে সমুদ্রের উচ্চতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো আমাদের জন্য শঙ্কার কারণ। এজন্য অবশ্য বহুলাংশে বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই দায়ী করা হয়। তবে এর পেছনে আমাদের দায়ও কোনো অংশে কম নয়। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে চলেছি নানা উপায়ে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষায় আমাদের উদ্যোগ সামান্যই বলা চলে। পরিবেশ দূষণের কারণে শুধু প্রাণহানিই নয়, আমাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বিশাল। পরিবেশ দূষণের কারণে যত ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে তার সবই আমরা দেখতে পাচ্ছি। পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, প্রাণহানি হচ্ছে, নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও বিরূপ রূপে হাজির হচ্ছে, হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতিও হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো সুখবর কিন্তু পাচ্ছি না। অনেকভাবেই আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে আমরাই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।
সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে দ্রুত ছুটতে গিয়ে পরিবেশের আরও বেশি ক্ষতি করছি আমরা। আর শিল্প-কারখানাগুলো অধিকাংশই শহরাঞ্চলে কিংবা এর আশপাশে হওয়ায় সেখানে দূষণের মাত্রা ও ক্ষতির পরিমাণও বেশি। হ্যাঁ, সারাবিশ্বেই এখন শিল্পের জয়-জয়কার। আমাদেরও তা থেকে দূরে থাকার সুযোগ নেই। বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে এবং নিজেদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শিল্পায়ন করতে হবে। কিন্তু আমাদের যেটি খেয়াল রাখতে হবে, পরিবেশও আমাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এও মনে রাখা দরকার, শিল্পায়ন স্থানান্তর করা সম্ভব কিন্তু পরিবেশের কিছু হারিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
গতকাল বুধবার (৩০ আগস্ট) বিকেলে বরগুনার তালতলী সওদাগরপাড়া সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় মাঠে ‘পরিবেশ, কৃষক ও মৎস্যজীবীর জীবন জীবিকা’ শীর্ষক নাগরিক সভায় আরও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, শিল্পায়নের কারণে নানাভাবেই আমরা পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
আমাদের পরিবেশের দ্বিতীয় লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত ট্যাংরা গিরি ইকোপার্কের অদূরেই জয়াল ভাঙ্গা এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এটা নিয়ে পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কথা কারও অজানা নয়। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্ব আগে থেকেই হুমকিতে রয়েছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে তা আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়বে সন্দেহ নেই। তালতলী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধোয়া সরাসরি আমাদের পরিবেশে মিশে গিয়ে বায়ুদূষণ করছে। তার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে পানি তো দূষিত হচ্ছেই, নদীতে থাকা অনেক জীবও হারিয়ে যাচ্ছে।
শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন পায়রা নদী থেকে বালু তুলে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভারসাম্যও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। হারিয়ে গেছে সম্ভাবনাময় শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত। কৃষিজমি হ্রাস আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার জন্যও হুমকি।অবশ্য নদী দূষণ ও নাব্য বৃদ্ধিসংক্রান্ত। সব মিলিয়ে শিল্পায়নের যুগে এ পর্যায়ে এসে পরিবেশ এবং শিল্প-কারখানা মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। একটিকে বেশি গুরুত্ব দিলে অন্যটি ক্ষতির মুখে পড়বে। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শিল্পায়নেরও বিকল্প নেই। পরিবেশের গুরুত্বও অনস্বীকার্য। এজন্য আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করেই শিল্পায়ন করতে হবে। আর সেটা করাও একটা বড় চ্যালেঞ্জই বটে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা, সাধারণ জনগণ সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। শিল্পায়ন করতে হবে ঠিক আছে, মোট কথা, শিল্প-কারখানার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদেরও কয়লা ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সৌরশক্তি ব্যবহার করে এক্ষেত্রে কিন্তু বেশ খানিকটা এগিয়েও গেছে।
আমাদের দেশকে আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য রেখে যেতে হলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ দায়িত্বটা আমাদেরই। আবার শিল্পায়নও আমাদের জন্য প্রয়োজন। এজন্য পরিবেশকে রক্ষা করে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। এ দুটোর মধ্যে সমন্বয় করা গেলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন খুবই সম্ভব। আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। তা হলো গাছ পরিবেশের বন্ধু। ১৬ কোটি মানুষ যদি জনপ্রতি একটি করেও গাছ লাগান, তাহলেও দেশে একটি পরিবেশ বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলা যায়। তা যদি করা সম্ভব হয় তাহলে এর ফল কী হতে পারে, তা বলে না দিলেও চলে।
মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় সকলকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিফাত আনোয়ার তুমপা বলেন,মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় সকলকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিফাত আনোয়ার তুমপা বলেন, ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে মাছ ধরা যাবে না। বনের গাছ ধ্বংস করা যাবে না আমরা নিজেরাই পরিবেশকে ধ্বংস করছি। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে স্লুইস গেট করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিবো। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাগরিক সভায় আরো বক্তব্য রাখেন পরিবেশ কর্মী নজরুল ইসলাম লিটু ও সিদ্দিকুর রহমান, মারুফ রায়হান তপু, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের বরগুনা জেলা শাখার সমন্বয়ক মুশফিক আরিফ ও তালতলী উপজেলা শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান, সওদাগর পাড়া আদর্শ সবজি চাষি সমিতির সভাপতি শাহাদাত হোসেন, তালতলী ব্লাড ডোনার ফাউন্ডেশনের সভাপতি ইমরান তাহের, মৎস্যজীবী শাহজাহান শেখ, কৃষক মো. রাসেল, আদিবাসী নেত্রী মায়েমেন রাখাইন প্রমুখ।