কলাপাড়া-কুয়াকাটা উপকূলে দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় সরকার আরোপিত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার কোন বাস্তবায়ন নেই । ইলিশ প্রজনন মৌসুমে কর্মবিমূখ হয়ে পড়া জেলেদের সরকার বিশেষ সহায়তার চাল দেয়ার পরও উপকূলের অসংখ্য ছোট ইঞ্জিন নৌকা, ফাইবার ট্রলার এবং গভীর সমুদ্র গামী মাঝারি ও বড় সাইজের মাছ ধরা ট্রলার সমুদ্রে মাছ শিকার করছে। একশ্রেনীর অসাধু মৎস্য আড়ৎ মালিকরা সিন্ডিকেট করে কোটি টাকার লেনদেনে তাদের আড়তে মাছ সরবরাহকারী জেলেদের অবৈধ এ সুযোগ করে দিয়ে অভিযুক্ত জেলেদের সাথেআহরিত মাছ দিয়ে সমন্বয় করছেন।
এতে দেশের মৎস্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন অসাধু আড়ৎ মালিকসহ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়োজিত সংশ্লিষ্টরা। যেসব জেলে আড়ৎ মালিকের সুবিধাভোগী তালিকায় নেই তারা কেউ মাছ ধরলে কেবল তাদের উপরই প্রয়োগ হচ্ছে সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ ১৯৮৩ আইনের খড়গ, এ অভিযোগ একাধিক জেলেদের।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, সমুদ্রে মাছের প্রজনন বৃদ্ধিতে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সকল ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার।
এসময় কর্মবিমূখ হয়ে পড়া জেলেদের প্রথম কিস্তিতে ৫৬ কেজি করে মানবিক সহায়তারচাল দিলেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার যেন কিছুতেই থামছেনা। চালু রয়েছে কলাপাড়া-কুয়াকাটা উপকূলের বেশ কিছু বরফকল। যারা ম্যানেজ করে চলছে, আইনের খড়গের কবলে পড়ছেনা তারা, তাদের কাছে অভিযানের তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে আগে-ভাগেই। অসাধু জেলেদের সাথে নৌ-পুলিশের এমন গোপন সখ্যতার অভিযোগে বদলী করা হয় কুয়াকাটা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক আখতার মোর্শেদকে।
এভাবেই বাবলাতলা, চাপলি, ধোলাইমার্কেট, গঙ্গামতি, ঢোস, বালিয়াতলী, আশাখালী, কুয়াকাটা, মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দর থেকে আহরিত মাছ প্রকাশ্যে নৌ ও সড়ক পথে বিক্রীর জন্য চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
শনিবার অনুসন্ধান ও সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কুয়াকাটা উপকূলের ইঞ্জিননৌকা প্রতি ৪-৫ হাজার টাকা, ফাইবার ও ছোট ট্রলার প্রতি ৭-৮ হাজার টাকাএবং মাঝারি ও বড় সাইজের ট্রলার প্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টদের দিয়ে সমুদ্রে নির্বিঘেœ মাছ শিকারের নেপথ্যে মদদ দিচ্ছেন আড়ৎ মালিক সিন্ডিকেট। যাতে নদী, সমুদ্র ও সমুদ্র মোহনায় দেড়ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি ফাঁসের ডান্ডি মাছের জাল, তিন ইঞ্চি বাই সাড়ে তিনইঞ্চি ফাঁসের ইলিশ জাল ও হাফ ইঞ্চি বাই হাফ ইঞ্চি চিংড়ি মাছ শিকারের জাল ব্যবহার করে নির্বিঘেœ মাছ শিকার করতে পারে জেলেরা। আর এসব তথ্য যাতে গনমাধ্যমে প্রকাশ না হয় এজন্য প্রভাবশালী কিছু সাংবাদিক ও তাদেও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন এসব অসাধু আড়ৎ মালিক সিন্ডিকেট।
এছাড়া সমুদ্র উপকূলে নৌ-পুলিশের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ ধামা-চাপা পড়ে এসব অসাধু মৎস্য আড়ৎ সিন্ডিকেটের তদ্বিরে। একাধিক জেলেরা দাবি করেন, ৫-৭ সদস্যের পরিবারে সরকারের দেয়া চাল দিয়ে তাদের কিছুই হয়না। চাল বাদে অন্য নিত্য পণ্যগুলো কিনতে টাকার প্রয়োজন। এজন্য আড়তদারদের কাছ থেকে তাদের দাদন নিতে হয়। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার এসময় বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, নোয়াখালী, চট্রগ্রাম ও ভোলার জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরছে। বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে ভারতের জেলেরাও প্রতিনিয়ত মাছ ধরছে। আলীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অনিয়ম হলেও সবাই দোষী নন। নিষেধাজ্ঞা আমাদের জেলেরা মানলেও ভারতের জেলেরা মানছেন না। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার সুফল আসছে না।
মেরিন ফিশারিজ কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান বলেন, ধোলাই মার্কেটে ১৯ জুন কোষ্টগার্ড, নিজামপুর ষ্টেশনের সিসি মতিউর রহমানকে নিয়ে অভিযানের সময় ১ হাজার টাকার মাছ নিলামে বিক্রী করাসহ ১ হাজার টাকা জরিমান করা হয়। কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ-পুলিশ পরিদর্শক সেকান্দার মিয়া বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কুয়াকাটা উপকূলে নৌ-পুলিশসতর্ক ভাবে দায়িত্ব পালন করছে। তবে তাদের অভিযানে কোন আটক কিংবা জব্দ নেই।
নৌ-পুলিশ বরিশাল জোনের পুলিশ সুপার মো. কফিল উদ্দিন কুয়াকাটা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক আখতার মোর্শেদের বদলী নিয়ে ডিপার্টমেন্টর প্রশাসনিক কিছু বিষয় আছে বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সাগরে মৎস্যবিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সুযোগ-সন্ধানী কিছু জেলেরা মাছ শিকার করছেন। তাদের জেল-জরিমানাও করা হচ্ছে। শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার ফিশারিজ অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, মুষ্টিমেয় মৎস্য আড়ৎ ব্যবসায়ী ও জেলেদের কারণে সরকারের মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি সফল হচ্ছেনা, প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধিসহ মাছের উৎপাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এসময় মাছ শিকার করা মানেই মাছের বংশ ধ্বংস করা। এটা দেশের স্বার্থে সবাইকে বুঝা দরকার।
মন্তব্য করুন