শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পকে ঘিরে ব্রিটিশদের..
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । ১৮:৪৮ | আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । ১৮:৪৮
আতাউর রহমান কাজল “ ব্যুরো চীফ, সিলেট”
বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। সবুজের সমারোহে ঘেরা এই অঞ্চলে ব্রিটিশরা চা শিল্পের সূচনা করেছিল প্রায় দুই শতাব্দী আগে। চা রপ্তানি ও বিপণন সহজ করতে তারা গড়ে তোলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে এবং প্রতিষ্ঠা করে শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন। এই রেল যোগাযোগই শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশে চা শিল্পের সূচনা মূলত ব্রিটিশ আমলে। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে প্রথম চা চাষ শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় দেশের প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৫৭ সালে সেখানে প্রথম বাণিজ্যিক চা উৎপাদন শুরু হয়। এখান থেকেই সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে চা শিল্পের যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে ব্রিটিশরা শ্রীমঙ্গলে নতুন নতুন চা-বাগান স্থাপন করতে থাকে।
চা শিল্পের প্রথম যুগে উৎপাদিত চা কলকাতায় পৌঁছানো হতো নদীপথে। সিলেটি কারিগরদের তৈরি বড় পালতোলা নৌকা এবং পরে প্যাডল স্টিমার ব্যবহার করে কলকাতার বন্দর পর্যন্ত চা পৌছে দেয়া হতো। সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদী হয়ে কলকাতায় পৌঁছাত সবুজ সোনা। তবে এই পরিবহন ব্যবস্থা ছিল সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। বর্ষায় নদীর বন্যা, আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীর অগভীরতা পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হতো।
চায়ের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন দেখে ব্রিটিশরা বুঝতে পারে দ্রুত পরিবহনের জন্য রেল নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। এই প্রয়োজন থেকেই ১৮৯২ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে আসাম ও সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলো সরাসরি কলকাতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৯১২ সালে শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে শ্রীমঙ্গলের চা শিল্প নতুন মাত্রা পায়। বিপুল পরিমাণ চা দ্রুত রেলপথে কলকাতায় পৌঁছে যেত এবং সেখান থেকে বিদেশে রপ্তানি করা হতো। রেল চালু হওয়ার ফলে শুধু চা নয়, শ্রমিকদের চলাচল, বাগানের যন্ত্রপাতি পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাও সহজ হয়ে যায়। ফলে শ্রীমঙ্গল এক অর্থে হয়ে ওঠে চা শিল্পের বাণিজ্যকেন্দ্র।
নদীপথে চা পরিবহন ছিল ধীরগতি ও অনিশ্চিত। বর্ষাকালে নৌযান চলাচল ব্যাহত হতো, আবার শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদী অগভীর হয়ে পড়ত। এ কারণে ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়তেন। অন্যদিকে রেলপথের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো। এ সুবিধার কারণেই অল্প সময়েই চা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে রেল।
শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পের বিকাশের পেছনে ব্রিটিশদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিজেরা অর্থনৈতিক লাভবান হওয়া। চা ছিল তাদের কাছে ‘সবুজ সোনা’। ব্রিটিশরা কলকাতাকে চা রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র বানায় এবং শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট-আসামের চা-বাগানগুলোকে সেই কেন্দ্রের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করে। এভাবেই চা সরাসরি ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বাজারে পৌঁছে যেত।
শ্রীমঙ্গলের চা শিল্প শুধু রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, এটি স্থানীয় সমাজ-অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক আনা হয় ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও ঝাড়খ- থেকেও। তাদের শ্রমে গড়ে ওঠে বিশাল সব চা-বাগান। রেল যোগাযোগের ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও বৃদ্ধি পায়। শহরের বাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, এবং শ্রীমঙ্গল ধীরে ধীরে একটি নগরকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
প্রথমে নদীপথ, পরে রেলপথ-এভাবেই শ্রীমঙ্গলের চা শিল্প এক নতুন ধাপে প্রবেশ করে। রেল যোগাযোগ শুধু অর্থনীতির গতিশীলতাই বাড়ায়নি, বরং শ্রীমঙ্গলের ভৌগলিক ও সমাজ কাঠামোকেও বদলে দেয় এবং পরবর্তীতে রেল হয়ে ওঠে চা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। আজও শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেল যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাস। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ও শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্রিটিশরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও, এর ফলেই আজকের শ্রীমঙ্গল হয়েছে বাংলাদেশের ‘চায়ের রাজধানী’। নদীপথ থেকে রেলপথে যাত্রা-এই পরিবর্তনই শ্রীমঙ্গলের চা শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছে।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রোমান চৌধুরী।
প্রকাশকঃ সানজিদা রেজিন মুন্নি।
সম্পাদকঃ কামরুজ্জামান বাঁধন।
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ জালাল উদ্দিন জুয়েল।
মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৭২৬৩, ০১৭১২-৮৩১৪৪৭
মেইলঃ rhbnews247@gmail.com, CC: rhbnews.nd@gmail.com
ঢাকা অফিসঃ এ্যাড পার্ক, ওয়াজী কমপ্লেক্স (৯ম তলা), ৩১/সি, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা -১০০০.