সকালের সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে ছাদবাগানে। সেই আলোর পরশে মেলে ধরেছে লাল, গোলাপি, হলুদ, কমলা ও সাদা রঙের পাপড়ি। ছোট ছোট মাংসল পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা ফুলগুলো যেন প্রকৃতির আপন হাতে আঁকা রঙিন ছবি। রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে প্রস্ফুটিত হয় ফুল, আর সবুজের বুকে জেগে ওঠে বর্ণিল সৌন্দর্য। অল্প জায়গা, সামান্য যত্ন আর একটু রোদেই এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে যে ফুল, তার নাম টাইম ফুল বা পর্তুলিকা।
শহরের বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা গ্রামের আঙিনায় পর্তুলিকা এখন সৌন্দর্যপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত। সহজে বেড়ে ওঠা, বিচিত্র রং এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফুল দেওয়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে এই উদ্ভিদ টব ও ছাদবাগানের জন্য বিশেষ উপযোগী। ফুলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর সহজ পরিচর্যাও গাছটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
পরিচিতি ও বৈজ্ঞানিক নাম
পর্তুলিকা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Portulaca grandiflora। ইংরেজিতে এটি Moss rose বা Rose moss নামে পরিচিত। বাংলাদেশে অনেকে একে টাইম ফুল, পরতুলিকা কিংবা পুর্তলিকা নামেও চেনেন। এটি পর্তুলিকা গণের একটি রসালো উদ্ভিদ। এর পাতা ও কাণ্ডে পানি সঞ্চিত থাকে বলে গাছটি তুলনামূলক শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।
পর্তুলিকার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের বিভিন্ন অঞ্চল। বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে এর চাষ হয়। উষ্ণ ও রোদপ্রধান আবহাওয়ায় ভালো জন্মে বলে বাংলাদেশের পরিবেশেও পর্তুলিকা সহজে বেড়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, Portulaca umbraticola নামেও পর্তুলিকা গণের আরেকটি প্রজাতি রয়েছে। প্রজাতিভেদে ফুলের গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য দেখা যায়। তাই সব পর্তুলিকাকে একই প্রজাতির উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
রঙিন পাপড়িতে অনন্য সৌন্দর্য
পর্তুলিকা ফুলের প্রধান আকর্ষণ এর উজ্জ্বল রং। লাল, গোলাপি, হলুদ, কমলা, সাদা ও বেগুনি—বিভিন্ন রঙের ফুল দেখা যায়। কোনো কোনো জাতের ফুলে একাধিক রঙের সমাহারও থাকে। একক ও বহুস্তরবিশিষ্ট পাপড়ির ফুল বাগানকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়।
গাছটির পাতা ছোট, সরু ও মাংসল। কাণ্ডও রসালো এবং সাধারণত মাটির কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অল্প সময়েই গাছটি টবের ওপর কিংবা বাগানের নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে সবুজের আবরণ তৈরি করতে পারে। ফুল ফুটলে সেই সবুজের মধ্যে রঙের অপূর্ব সমারোহ সৃষ্টি হয়।
পর্তুলিকার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সূর্যালোকের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক। পর্যাপ্ত আলো ও উষ্ণ আবহাওয়ায় ফুলগুলো সাধারণত ভালোভাবে ফোটে। বিকেলের দিকে কিংবা আকাশ মেঘলা থাকলে অনেক জাতের ফুলের পাপড়ি বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন রোদ উঠলে আবার পাপড়ি মেলে ধরে। এ কারণে ফুলটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে রোদেলা দিন বিশেষ উপযোগী।
অল্প যত্নেই ফুলের সমারোহ
পর্তুলিকা চাষের জন্য বড় জায়গা কিংবা ব্যয়বহুল উপকরণের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা বাগানের রোদেলা স্থানে সহজেই এর চাষ করা যায়।
পানি সহজে বেরিয়ে যায় এমন বেলে বা বেলে-দোআঁশ মাটি এ ফুলের জন্য ভালো। টবে চাষ করলে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র থাকা জরুরি। প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে আট ঘণ্টা সরাসরি রোদ পেলে গাছটি সাধারণত ভালো ফুল দেয়।
মাটির ওপরের অংশ শুকিয়ে এলে প্রয়োজনমতো পানি দিতে হবে। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে। মাটিতে পরিমিত জৈব কম্পোস্ট ব্যবহার করলেই সাধারণত যথেষ্ট। বীজ অথবা সুস্থ কাণ্ডের কাটিং থেকে সহজেই নতুন চারা তৈরি করা যায়।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ভূমিকা
পর্তুলিকা শুধু সৌন্দর্যবর্ধক ফুল নয়, বাগানের ক্ষুদ্র জীববৈচিত্র্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। ফুলে মধু ও পরাগ সংগ্রহ করতে মৌমাছি এবং অন্যান্য পরাগবাহি পতঙ্গের আগমন ঘটে। উপযুক্ত পরিবেশে এসব পতঙ্গের উপস্থিতি বাগানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। তবে সব জাতের ফুল সব ধরনের পরাগবাহি পতঙ্গকে সমানভাবে আকর্ষণ করে না।
গাছটি মাটির ওপর ছড়িয়ে বেড়ে ওঠায় কিছু ক্ষেত্রে মাটির উপরিভাগ ঢেকে রাখতে সাহায্য করে। তবে এর প্রধান অবদান হলো অল্প জায়গায় সবুজ ও রঙিন পরিবেশ সৃষ্টি করা। পর্তুলিকা গণের কিছু প্রজাতি ভোজ্য হিসেবে পরিচিত হলেও সব শোভাবর্ধক জাতকে খাবার উপযোগী ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ছোট্ট টবে প্রকৃতির রঙিন উপহার
বর্তমানে শহর ও মফস্বলের অনেক বাড়িতে ছাদবাগান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সীমিত জায়গায় সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য পর্তুলিকা হতে পারে চমৎকার একটি পছন্দ। কয়েকটি ছোট টবে বিভিন্ন রঙের চারা লাগালেই তৈরি হয় রঙিন ফুলের সমাহার। আর বাগানের মাটিতে লাগালে গাছটি ছড়িয়ে পড়ে তৈরি করতে পারে সবুজের ওপর ফুলের রঙিন গালিচা।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে বড় বাগান থাকা জরুরি নয়। একটি ছোট টব, সামান্য মাটি আর পর্যাপ্ত সূর্যালোকেই ফুটে উঠতে পারে রঙের উৎসব। সেই উৎসবে পর্তুলিকা তার উজ্জ্বল পাপড়ি মেলে ধরে ঘরের পরিবেশে যোগ করে আনন্দ, সৌন্দর্য ও প্রাণচাঞ্চল্য।
তাই ছাদবাগান কিংবা বাড়ির আঙিনা সাজাতে টাইম ফুল বা পর্তুলিকা হতে পারে সহজ, সাশ্রয়ী ও দৃষ্টিনন্দন একটি পছন্দ।
ছবিগুলো ফরেস্ট অফিস রোডের শিক্ষক কল্লোল দেবের বাসার ছাদ বাগান থেকে গতকাল তোলা।
মন্তব্য করুন