শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষে রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ৫ মিনিটের দিকে রংপুর মহানগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়ে অবস্থিত ধর্মসভা মন্দিরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকারসহ পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা। পরে তিনি মণ্ডপে উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং তাঁদের অনুরোধে সেলফি তোলেন।

মন্দিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এই ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, হাজার বছর ধরে এ দেশের মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করছেন। ভবিষ্যতেও যেন সবাই শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সেটিই তাঁর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, “এই দেশটি হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। শান্তিতে আমরা সকলে মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই, আগামী হাজার বছরেও যেন আমরা একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ভোট দেওয়া-না দেওয়া নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের সরকার হতে চায়। মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেন তিনি।

রংপুর মহানগরীর উন্নয়নে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করতে চায় সরকার। গ্রামাঞ্চলে সেতু-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য বা দাবি থাকলে তা সংসদে আলোচনা করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি না করে জনগণের কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের শুভ নবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়েই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ সময় মন্দিরের পেছনে হোস্টেলের মতো একটি অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানান তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেন।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন – সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্তু কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরীসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং রংপুরের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানবাহিনীর একটি বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে আয়োজিত দুটি পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। এ সময় সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান।

পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করার কথাও তুলে ধরেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম রংপুর সফর।