মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গত তিন মাসে অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির অন্তত ৩০টি সাপ লোকালয়ে চলে এসেছে। খবর পেয়ে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকারী দল সাপগুলো উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে হস্তান্তর করেছে। পরে সেগুলোকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।

প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সাপ উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোনোটি বাড়ির রান্নাঘরে, কোনোটি ধানক্ষেতে, আবার কোনোটি বসতঘরের দেয়ালের ফাঁকে কিংবা টিনের চালের ওপর আশ্রয় নিচ্ছে। বড় আকারের অজগর সাপ লোকালয়ে চলে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়; বরং বর্ষাকালের স্বাভাবিক পরিবেশগত পরিবর্তনের ফল।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, উদ্ধার হওয়া সাপগুলোর অধিকাংশই বর্ষার পানিতে আবাসস্থল প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে এসেছে। অনেক সময় তারা হাঁস-মুরগি, কবুতর কিংবা ছোট ছাগল শিকার করে। এতে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন মানুষ সাপ না মেরে উদ্ধারকারীদের খবর দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “আগে মানুষ সাপ দেখলেই পিটিয়ে মেরে ফেলত। এখন সচেতনতা অনেক বেড়েছে। মানুষ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন কিংবা বনপ্রাণী বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপ উদ্ধার করে বন্যপ্রানী বিভাগের কার্যালয়ে হস্তান্তর করছে। বন্যপ্রানী বিভাগ এগুলোকে লাউয়াছড়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করছে।”

লোকালয়ে সাপের উপস্থিতির কারণ জানতে বুধবার রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান-এর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বর্ষাকালে বন, ঝোপঝাড়, গর্ত ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে সাপ তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু ও শুকনো জায়গার সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে।

তিনি আরও বলেন, “অজগর বড় হওয়ায় সহজেই মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু অজগর নির্বিষ এবং স্বভাবগতভাবে ধীরগতির। তারা মানুষকে আক্রমণ করতে আসে না। সুযোগ পেলে নিজেরাই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে চায়।”

ড. মনিরুল এইচ খান জানান, বাংলাদেশে পাওয়া সাপের প্রায় ৮০ শতাংশই নির্বিষ। অধিকাংশ সাপ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়। মানুষ যদি সাপকে উত্ত্যক্ত না করে বা আঘাত না করে, তাহলে সাপও সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না।

প্রকৃতিবিদদের মতে, সাপ পরিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে হত্যা না করে সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী সংস্থা বা বনপ্রানী বিভাগকে খবর দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল কাজ।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীমঙ্গলে সাপ উদ্ধার বৃদ্ধির ঘটনাকে বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং বর্ষাকালে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সচেতনতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।