মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের উকিলবাড়ি রোডে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বসে ব্যতিক্রমধর্মী এক হাট। এটি কোনো সবজি, গবাদিপশু বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হাট নয়; এটি বাঁশের তৈরী মাছ ধরার ফাঁদ ‘চাই’-এর হাট। বর্ষা মৌসুম এলেই এ হাটে বাড়তে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। স্থানীয় মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলার পাইকারি ব্যবসায়ীরাও ভিড় জমান এই হাটে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও, রুস্তমপুর, ভুনবীর, মনারগাঁও, কামারপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার দক্ষ কারিগররা নিজ হাতে তৈরি বাঁশের চাই নিয়ে আসেন এই হাটে। ভোর থেকে শুরু হওয়া বেচাকেনা চলে বিকেল পর্যন্ত। সারি সারি সাজানো শত শত চাই এক অনন্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি পথচারীদেরও আকৃষ্ট করে।
শুধু শ্রীমঙ্গলের মানুষই নন, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মৎস্যজীবীরা এখান থেকে চাই কিনে নিয়ে যান। এছাড়া পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই হাট থেকে বিপুল পরিমাণ চাই কিনে সিলেটের শেরপুর, মাধবপুর, নবীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। ফলে এই হাট স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শনিবার চাইয়ের হাটে কথা হয় ব্যবসায়ী সুপেন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমে মাছ ধরার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ডজন চাই ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। তবে মৌসুম শেষ হলে চাহিদা কমে যায় এবং তখন প্রতি ডজন চাইয়ের দাম নেমে আসে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়।
মৎস্যজীবীদের কাছে চাই একটি বহুল ব্যবহৃত ও কার্যকর মাছ ধরার উপকরণ। বাঁশের কঞ্চি বা বেত দিয়ে তৈরি এসব চাই খাল, বিল, ছড়া, ডোবা, ধানক্ষেত, ছোট নদী ও হাওরে বসিয়ে রাখা হয়। এর বিশেষ নকশার কারণে মাছ একমুখী প্রবেশপথ দিয়ে সহজেই ভেতরে ঢুকতে পারে, কিন্তু পরে আর বের হতে পারে না। এভাবে পুঁটি, টেংরা, কৈ, শিং, মাগুর, খলিসা, চিংড়িসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি আকারের মাছ ধরা হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার ফাঁদ বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও একে চাই, কোথাও চারু, ডরি, মাছ ধরার ফাঁদ, মাছ ধরার খাঁচা কিংবা বাঁশের চাই বলা হয়। নাম ভিন্ন হলেও এর ব্যবহার ও কার্যকারিতা প্রায় একই।
গ্রামীণ জনপদে বাঁশের চাইয়ের জনপ্রিয়তা এখনো অটুট। পরিবেশবান্ধব ও সহজলভ্য এই মাছ ধরার উপকরণ আজও গ্রামীণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। শ্রীমঙ্গলের উকিলবাড়ি রোডের এই চাইয়ের হাট সেই লোকজ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে এবং স্থানীয় কারিগরদের জীবিকা নির্বাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
মন্তব্য করুন