কলেরার টিকা পেয়ে স্বস্তিতে জনসাধারণ
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । ২১:২৪ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । ২১:২৪
ষ্টাফ করেসপন্ডেন্ট:-
পানিবাহিত রোগ কলেরা প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুরু হয়েছে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’। কর্মসূচির আওতায় দুই দফায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে মুখে খাওয়ার কলেরা প্রতিরোধক টিকা দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই টিকা পাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।
গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বছর বা তার বেশি বয়সী সবাইকে ইউরিকল প্লাস নামের এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ সহযোগিতায় গত ২২ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে প্রথম ধাপের টিকাদান কর্মসূচি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে।
কর্মসূচির আওতায় দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় টিকাদান শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগরেও এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
গত ২০ আগস্ট কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, কলেরার টিকা দেওয়ার এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
টিকা পেয়ে স্বস্তিতে অভিভাবকরা
রাজধানীর লালবাগ দোতলা মসজিদ এলাকা থেকে চার বছর বয়সী মেয়ে নওরিন আক্তার জুঁইকে কলেরার টিকা খাওয়াতে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন মা ফাতেমা আক্তার।
তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে মেয়েটার পেটের সমস্যা হতো। সবাই হাত ধুয়ে খাবার খাওয়াতে, ভালো পানি দিয়ে রান্না করতে এবং পানি ফুটিয়ে খাওয়াতে বলত। এসবই করতাম, কিন্তু পেটের সমস্যা লেগেই থাকত। সরকার বিনামূল্যে কলেরার টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ।’
আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে দুই বছরের ছেলে অর্ণব সরকারকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন মা পলি সরকার। তিনি বলেন, ‘ছেলেটার সারা বছরই শরীর খারাপ থাকে। পেটের সমস্যাও আছে। আজ প্রথম ডোজ খাওয়ানো হয়েছে। আগামী মাসের ২৬ তারিখ দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াব। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এমন উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ।’
কেন্দ্রে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি
আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের টিকাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষকে যত্নসহকারে কলেরার টিকা খাওয়ানো হচ্ছে।
কেন্দ্রের কর্মী তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘আমরা সকাল থেকেই টিকা কার্যক্রম শুরু করেছি। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসছেন, নাম এন্ট্রি করে টিকা নিয়ে যাচ্ছেন। এক মাস পর সবাইকে আবার এসে দ্বিতীয় ডোজ নিতে বলা হচ্ছে। টিকা কার্ডেও বিষয়টি লিখে দেওয়া হচ্ছে।’
সরেজমিনে বিভিন্ন টিকাকেন্দ্রে দেখা যায়, কর্মীদের একজন টিকা নিতে আসা ব্যক্তির নাম নথিভুক্ত করছেন, একজন অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করছেন এবং রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে আরেকজন টিকা খাওয়াচ্ছেন। অন্য কর্মীরা কেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় গিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন এবং মানুষকে কলেরার টিকা নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করছেন।
ডেঙ্গু-হামের পাশাপাশি কলেরা নিয়েও উদ্বেগ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তেজগাঁও এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি টিকাকেন্দ্রে দুই সন্তানকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন আজিজুর রহমান। তার এক সন্তানের বয়স ৭ বছর এবং অন্যজনের সাড়ে ৩ বছর।
টিকা খাওয়ানো শেষে তিনি বলেন, ‘কিছুদিন ধরে ডেঙ্গু ও হাম নিয়ে খুব ভয়ে আছি। এর মধ্যে যদি আবার ডায়রিয়া শুরু হয়, তাহলে সমস্যা। দুই ছেলেকে কলেরার প্রথম ডোজ খাওয়াতে পেরে ভালো লাগছে। ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। আগামী মাসের ২৬ তারিখে আবার দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াতে হবে।’
ধাপে ধাপে টিকা দেওয়া হবে ১৪৪ উপজেলায়
অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, বর্তমানে প্রথম ধাপে ১৪টি উপজেলায় টিকাদান চলছে। পরে ধাপে ধাপে উচ্চঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলায় এই টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি জানান, দুই ধাপে দেওয়া এই টিকার সুরক্ষা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বিশ্বজুড়ে কলেরার ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। এ রোগে মারা যান প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ। বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এখনও কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়।
আইসিডিডিআর,বি এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিবদ্ধ কলেরা রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৪১ জন। গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আক্রান্তের হার ছিল সর্বোচ্চ। পরে তা কমে এলেও ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা আবারও বাড়তে থাকে।
পানিবাহিত এই রোগ প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, খাবার তৈরিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রোমান চৌধুরী।
প্রকাশকঃ সানজিদা রেজিন মুন্নি।
সম্পাদকঃ কামরুজ্জামান বাঁধন।
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ জালাল উদ্দিন জুয়েল।
মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৭২৬৩, ০১৭১২-৮৩১৪৪৭
মেইলঃ rhbnews247@gmail.com, CC: rhbnews.nd@gmail.com
ঢাকা অফিসঃ এ্যাড পার্ক, ওয়াজী কমপ্লেক্স (৯ম তলা), ৩১/সি, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা -১০০০.