কুয়াকাটা সৈকতে শৃঙ্খলা রক্ষায় নেই..

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৩ । ২১:২৪ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২৩ । ২১:২৪

আব্দুল কাইয়ুম আরজু কুয়াকাটা করেসপন্ডেন্ট:-

“আমরা দ্বিতীয়বার কুয়াকাটা ভ্রমনে আসবো না!” সৈকতে এসে ভোগান্তির শিকার হয়ে প্রথমেই এমন মন্তব্য করেন ঢাকা মিরপুর থেকে আসা পর্যটক সামিউল ইসলাম-সালমা দম্পতি। তারা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে আসার প্রধান কারন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দৃশ্য অবলোকন করা। তবে সৈকতে প্রধান প্রবেশ পথে সড়কে চৌরাস্তা জিরো পয়েন্টে অটোভ্যান-ইজিবাইকের গড়ে ওঠা যত্রতত্র স্টান্ড। সংকীর্ণ সড়কে স্বাভাবিক চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা যেমন, আবার সৈকতে জিরো পয়েন্টে নামলেই মটর বাইক, ফটোগ্রাফার, অটোভ্যান-ইজিবাইক, বীচ বাইক সহ সমুদ্রে গোসলে নেমে ওয়াটার বাইক, স্পীডবোট চালকদের যে পরিমান হয়রানির শিকার হতে হয়, এর জাতাকলে কুয়াকাটা ভ্রমনের স্বাদ মিটে গেছে। এসব পরিবর্তন না হলে আমাদের পরিচিত কাউকে কুয়াকাটা ভ্রমনে আসার জন্য বলবো না! আর এমন অনিয়ম চলতে থাকলে কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র পড়বে হুমকির মুখে। আমাদের মতো অনেক পর্যটক ভ্রমন বিমুখ হবেন এই সৈকতে। তারা আরো বলেন, একটি অন্যতম সমুদ্র সৈকতে রয়েছে নানা অনিয়ম। সেখানে আমরা কেনইবা পরবর্তীতে ভ্রমনে আসবো? দেশের অনেক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে যেখানে কুয়াকাটা সৈকতের চাইতেও সেবা ও মানে আধুনিক। এবং সেসব পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে প্রশাসনিক কঠোরতা। কুয়াকাটায় পর্যটক ধরে রাখতে দ্রুত প্রশাসনের পক্ষ থেকে সৈকতে এসকল শৃঙ্খলা রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে এমন দাবী তাদের। একাধিক পর্যটকের সাথে কথা হলে পাওয়া যায় একই বিষয়ে অসংখ্য অনিয়মের অভিযোগ।

পটুয়াখালীর সাগরকণ্যা খ্যাত কুয়াকাটা দেশের একটি অন্যতম পর্যটন নগরী। এই পর্যটন নগরী ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘের এই সমুদ্র সৈকতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা প্রায় সারাবছর ভ্রমনে আসেন। তবে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের নিয়ম শৃঙ্খলায় দৃশ্যমান অবনতি দেখে হতবাক হচ্ছেন পর্যটকরা। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের অব্যবস্থাপনা ও নানা অনিয়মে চিন্তিত বিনিয়োগকারীরাও। অচিরেই সৈকতের নান্দনিক পরিবেশ এবং নিয়ম শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না গেলে মুখ ফিরিয়ে নিবেন ভ্রমন পিপাসু মানুষ।

পদ্মাসেতুর সুফলে কুয়াকাটায় পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি সমুদ্র সৈকতে সেবার মান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ঘিরে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বর্তমান সমুদ্র সৈকতের সেবার বিপর্যয় ও নানা অনিয়মের ফলে বিনিয়োগ বিমুখ হচ্ছেন অনেকেই। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসন সহ জেলা প্রশাসন যে উদ্যোগ নিচ্ছে তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। তবে সৈকত পরিপাটি রাখতে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করেলেও তা সাময়িক। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা, আবাসিক এবং খাবার হোটেলের বর্জ্য, জেলেদের জাল-নৌকা, ভাঙ্গাচূরা ও পলিথিনের ঝুঁপড়ি ঘর ও ময়লার ভাগাড়, ছাতা-বেঞ্চির পেছনে একই স্থানে জেলেদের জাল মেরামত ও মাছের কারবার; এসব আপসারনে প্রশাসনের উদ্যোগ কোনো কাজে আসছে না। পর্যটন কেন্দ্রের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সৈকত সংস্লিষ্ট ব্যবসায়ী সহ স্থানীয় জেলেদের কারো  কোনো গুরুত্ব নেই এসবের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সৈকতে প্রবেশমুখে স্থানীয় প্রশাসনের কোনো তৎপরতা না থাকায় অর্ধ শতাধিক ব্যাটারি চালিত অটোভ্যান, ইজিবাইকের স্টান্ড গড়ে ওঠায় সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পর্যটকের স্বাভাবিক চলাচল এবং সড়কে যান চলাচলে সিমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কুয়াকাটা সৈকতের প্রধান ফটকেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সৈকতের প্রবেশ মুখে মটর বাইক এবং ফটোগ্রাফাদের ভোগান্তি উল্লেখ্যযোগ্য। নিয়ম নেই স্পীডবোট সহ বিচ বাইকারদেরও। স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের কোনো তদারকি না থাকায় বহিরাগত যানবাহন চালকরা সড়কের দুইপাশ দখল করে নানা হয়রানি করছেন পর্যটকদের। পর্যটকদের সেবাদানে মনিটরিং নেই সৈকতে বহিরাগত চালকদের চিহ্নিত করনেও। কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি একজন পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিলেও ব্যর্থ হয়েছে সৈকতের নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষায় বলে দাবী সংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক আশরাফুল-নদী জামান দম্পতি বলেন, যেখানে সৈকতের জিরো পয়েন্ট এলাকায় পা রেখেই ভোগান্তির শুরু হয়। কুয়াকাটায় বর্তমানে সেবার যে অগ্রগতি তা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কখনোই প্রত্যাশা করা যায়না। আমরা এবার এসে যেসকল অনিয়ম উপলব্ধি করলাম এসব পরিবর্তন না হলে পরবর্তীতে কুয়াকাটা ভ্রমনে আসার প্রশ্নই আসেনা। সৈকতের প্রতিটি সেক্টরেই অনিয়ম বিছানো। বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের দেশকে তুলে ধরতে সৈকতকে আরো স্বাস্থসম্মত ও সুন্দরভাবে গোছানোর দাবী তাদের।

বরিশাল থেকে পরিবার নিয়ে ভ্রমনে আসা পর্যটক পারভিন আক্তার বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ভ্রমন আমাদের দক্ষিনাঞ্চল বাসীর জন্য একটি ভাগ্যের সোপান। আমারা মূলত এখানে আসি রিফ্রেশমেন্টের জন্য। কিন্তু চৌরাস্তা থেকে বীচের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত কোনো শৃঙ্খলা নেই। সিবীচের প্রধান ফটকে বিভিন্ন যানবাহনের যে অবাধ বিচরন এবং হর্ণের শব্দ; এটি যেমন অস্বস্থিকর, অন্যদিকে নিরাপদে চলাফেরা করা দুষ্কর। এসকল যানবাহন থাকবে একটি নির্ধারিত এড়িয়ার বাইরে। এসবের কারনে আমাদের সমুদ্র উপভোগে ভোগান্তিত হয়। হাজার হাজার পর্যটকদের ভীড় ঠেলে মটর বাইক, ইজি-বাইক, বিচ বাইক ঢুকে পরছে যে যার মতো। সঠিক নিয়ম পালনে প্রশাসনিক কোনো তৎপরতা আমরা লক্ষ্য করছি না। যদিও কোনো দর্শনীয় স্পটে যাওয়ার প্রয়োজন হয় তা আমরাই খুঁজে নিবো। পর্যটক সেবাদানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশিত সাইনবোর্ড থাকা দরকার। যা কুয়াকাটা সৈকতে ভ্রমনের জন্য শতভাগ নিরাপদ হবে। কিন্তু সেসবের কিছুই দৃশ্যমান নেই এই পর্যটন কেন্দ্রে।

মাদারীপুর থেকে আসা পর্যটক দেব, বাদল আর বাধন বলেন, বীচে নামলেই মটর বাইক, ফটগ্রাফাররা ঘিরে ধরে। ছবি তোলা, কোথাও যেতে ইচ্ছে না হলেও তারা পেছনে লেগে থাকে একের পর এক জন। কোনো স্বস্তি পাওয়া যায়না মূল সৈকতে চলাফেরায়। এটি আমাদের জন্য খুবই বিরক্তির কারন। সমুদ্রে গোসলে নামলে স্পিড বোটের লোকজনও একই অবস্থা করে তোলে। এমন অনিয়ম রোধে সৈকতে আইনি পদক্ষেপ জরুরী।
ঢাকা থেকে আগত পর্যটক সঙ্কর রায় বলেন, বীচে আসলেই বিভিন্ন সেবার নামে আমরা যে পরিমান হয়রানির শিকার হই তার জন্য আমাদের কুয়াকাটা ভ্রমনের মানষিকতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বাউফলের দর্শনার্থী নাঈম আব্দুল্লাহ বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে পরিবেশের কোন পরিপাটি নেই। সৈকতের মধ্যে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা, জাল ফালানো, জেলেদের অপরিকল্পিত ভাবে রাখা নৌকা, পলিথিন দিয়ে ঝুঁপড়ি ঘর, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যবসায়ীদের ভাসমান দোকানপাট দেখে আমরা রিতিমতো হতাশ। এমন পরিবেশ দেশের একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রের সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যের সাথে কখনোই কাম্য নয়।

ঢাকা বনানী থেকে আসা পর্যটক আনোয়ার, খুলনার হাবিবুল্লাহ নিয়াজ, ভোলার শিমুল হাওলাদার সহ একাধিক পর্যটকরা জানান, সৈকতের প্রতিটি সেক্টরের জন্য আলাদা জোন করে দিলে কেউ আর হয়রানির শিকার হবেনা। কুয়াকাটা বিভিন্ন দর্শনীয় স্পট ভ্রমন সুবিধার জন্য কোন দিকে কি আছে, দর্শনীয় স্পটে যাওয়া আসার কতটুকো পথ, সময় ও ভাড়া নির্দেশিত সাইনবোর্ড স্থাপন করে দিলে সৈকতে এসে কেউ আর ভোগান্তিতে পরবে না। এতে যে যার পছন্দ মতো সেবা নিতে পারবেন। আমরা দেশের অনেক পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, একমাত্র কুয়াকাটা এসে এতো অনিয়ম ও অব্যাবস্থাপনা আর কোথাও দেখিনি। বিষয়গুলো খুবই হতাশাজনক। কুয়াকাটায় মানুষ আসেই সমুদ্র উপভোগ করার জন্য। এখানে এসে কি নানা অনিয়ম, ভোগান্তির মধ্যে পরতে চায় কেউ? সেই অনেক পথ পারি দিয়ে বিনোদনের জন্য এসে যদি নোংরা পরিবেশ এবং অনিয়মের মধ্যে কাটাতে হয় সেখানে পরবর্তীতে কেউ আসতে চায়? কুয়াকাটা ভ্রমনে এসে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যেতে হয় কেন? আবাসিক হোটেলগুলোয় একেক সময় একেক হারে ভাড়া নিয়ে থাকেন। প্রশাসনের তরফ থেকে এর জন্য একটি নির্ধারিত রেট করে দিতে হবে। এবং কুয়াকাটায় পর্যটক টানতে সকল অব্যাবস্থাপনা রোধে পর্যটন কেন্দ্রে জরুরী আইন প্রয়োগ করতে এমন মন্তব্য তাদের।

কুয়াকাটা পৌর মেয়র আনোয়ার হাওলাদার জানান, কুয়াকাটা পৌরসভার পক্ষ থেকে সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কুয়াকাটা পৌরসভায় বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এর আওতায় চৌরাস্তায় একটি গোল চতত্ত্বর করা হবে। এবং ডিজিটাল সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে সড়কের দুই পাশে, যাতে কুয়াকাটায় আগত পর্যটকরা দর্শনীয় স্পট ভ্রমনে একটি দিক নির্দেশনা পায়। এতে করে  যত্রতত্র যানবাহনের স্টান্ড গড়ে ওঠার আর সুযোগ থাকবে না। তবে কুয়াকাটার উন্নয়নে পৌরসভা গঠন করা হলেও সৈকত উন্নয়নে পৌরসভার কোনো ভূমিকা নেই। এর দায়দায়িত্ব কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও  কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কুয়াকাটা একটি আধুনিক মানের পর্যটন নগরী উপহার দিতে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যেসকল বিষয় গুলোতে পর্যটকদের আপত্তি রয়েছে এবং ভোগান্তির বিষয় সামনে এসেছে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে বনায়ন করা সহ মেরিন ড্রাইভের আদলে একটি সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। অচিরেই কুয়াকাটা সৈকতে নান্দনিক সৌন্দর্য ফিরে পাবে। এছাড়াও যত্রতত্র ভাসমান ব্যবসায়ীদের দোকানপাট শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হয়েছে। সৈকতের অন্যান্য বিষয় গুলো নিয়ে আমারা কাজ করছি। কুয়াকাটা পর্যটন নগরীর শৃংঙ্খলা ও সৌন্দর্যের প্রশ্নে আমরা কোন আপোষ করব না বলে জানান এই কর্মকর্তা। ###

উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রোমান চৌধুরী।

প্রকাশকঃ  সানজিদা রেজিন মুন্নি।

সম্পাদকঃ কামরুজ্জামান বাঁধন।

নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ জালাল উদ্দিন জুয়েল।

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯৫৭২৬৩, ০১৭১২-৮৩১৪৪৭

মেইলঃ rhbnews247@gmail.com, CC: rhbnews.nd@gmail.com

ঢাকা অফিসঃ এ্যাড পার্ক, ওয়াজী কমপ্লেক্স (৯ম তলা), ৩১/সি, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা -১০০০.

error: Content is protected !!