শরতের শুভ্রতায় সেজেছে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। সবুজ চা-বাগানের বুক চিরে বয়ে চলা ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাড়জুড়ে ফুটে থাকা ধবধবে সাদা কাশফুল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এই কাশবন দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে শুক্রবার, শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে এখানে দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়। চলছে ছবি ও সেলফি তোলার ধুম।
শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের টার্নিং পয়েন্টের কাছেই ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই মনোমুগ্ধকর কাশবন। শহর থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরের এই স্থানটি আগস্টের মাঝামাঝি থেকেই দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে শরৎ আসে শুভ্রতার বার্তা নিয়ে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল যেন শরতের আগমনী গান শোনায়। নদীর তীর, বালুচর কিংবা গ্রামের উঁচু জমিতে একসময় প্রচুর কাশবন দেখা গেলেও কালের বিবর্তনে সেই চিরচেনা দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারিয়ে যেতে বসা কাশবনের সৌন্দর্যই যেন নতুন করে ধরা দিয়েছে শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে।
সবুজের মাঝে শুভ্রতার উৎসব শহরের ব্যস্ততা ও যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল পেরিয়ে ভুরভুরিয়া ছড়ার কাছে পৌঁছালেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। দুই পাশে সবুজ চা-বাগান, মাঝখানে পিচঢালা সড়ক আর টিলার ভাঁজে ভাঁজে চায়ের বাগানÑতারই ফাঁকে বিস্তীর্ণ সাদা কাশফুলের সমারোহ। প্রকৃতির এমন মায়াবী আয়োজন মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়।
শ্রীমঙ্গল শহরের জিরো পয়েন্ট চৌমোহনা থেকে চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ ধরে এখানে আসার সময়ও চোখে পড়ে মনভোলানো দৃশ্য। রাস্তার দুই পাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। ভাগ্য ভালো থাকলে চা-বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের চা-পাতা চয়নের মনোরম দৃশ্যও চোখে পড়ে। কখনো দেখা মেলে বানরসহ নানা বন্যপ্রাণীরও।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামলেই চোখে পড়ে কাশফুলের শুভ্র সমুদ্র। ভুরভুরিয়া ছড়ায় এখন পানি খুবই কম। ফলে সহজেই ছড়া পার হয়ে কাশবনের অন্য প্রান্তে যাওয়া যায়। ছড়ার দুই পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে দর্শনার্থীরা উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীÑসব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে কাশবন। কেউ কাশফুলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে সেলফিতে মেতে উঠেছেন। তরুণীদের কেউ কেউ খোঁপায় কাশফুল গেঁথে নিচ্ছেন। সাদা কাশফুলের সঙ্গে ছবি তুলে শরতের স্মৃতি ধরে রাখছেন অনেকেই।
গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। ছুটির দিনে ভিড় আরও বেশি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আসছেন, আবার কেউ কেউ দল বেঁধে ছুটে আসছেন কাশবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। একজন দর্শনার্থী বলেন, শহরের এত কাছে এমন মনোরম পরিবেশ আছে, তা এখানে না এলে বোঝা যায় না। চারদিকে সবুজ চা-বাগান আর তার মাঝখানে সাদা কাশফুলÑদৃশ্যটি সত্যিই অসাধারণ।
শ্রীমঙ্গল কাশফুল শুধু একটি ফুল নয়, বাংলার প্রকৃতিতে শরতের এক চিরচেনা প্রতীক। নীল আকাশের নিচে বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের শুভ্রতা মানুষের মনে অন্যরকম আবেগ তৈরি করে। প্রকৃতির এই সাময়িক সৌন্দর্য দেখতে তাই প্রতিবছরই মানুষ ছুটে যায় কাশবনে।
শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া ছড়ার দুই পাড়ের কাশবনও এখন তেমনই এক আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সবুজ চা-বাগানের মাঝে সাদা কাশফুলের বিস্তীর্ণ সমারোহ, ছড়ার নির্মল পরিবেশ এবং চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক আবহ।
শহর থেকে মাত্র ১০-১৫ মিনিটের পথ। অথচ সেখানে পৌঁছালেই মনে হয়, নাগরিক কোলাহল থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির এক নির্জন রাজ্যে এসে পড়েছেন। শরতের এই অল্প সময়ের জন্য ভুরভুরিয়া ছড়ার পাড়ে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকে দিয়েছে শুভ্রতার এক অপূর্ব ছবি।
মন্তব্য করুন