শ্রীমঙ্গলের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত বন্যপ্রাণী সংগ্রহশালা ‘শীতেষ বাবুর চিড়িয়াখানা (বন্য পশুপাখি সেবাশ্রম)’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান, সবার প্রিয় শীতেষ রঞ্জন দেব আর নেই। মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৫ মিনিটে শ্রীমঙ্গল শহরের মিশন রোডস্থ নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

শীতেষ রঞ্জন দেব ছিলেন অত্যন্ত সৎ, বিনয়ী, হৃদয়বান ও মানবদরদী একজন মানুষ। মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, সহমর্মিতা এবং সাহায্যের মানসিকতা ছিল অনুকরণীয়। প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা তাঁকে দেশের অন্যতম নিবেদিতপ্রাণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীতে পরিণত করেছিল।

মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর মিশন রোডস্থ বাসভবনে ছুটে আসেন এবং শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের পারিবারিক শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

নিজস্ব উদ্যোগে তিনি শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আজীবন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সেবার কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।

লোকালয়ে চলে আসা কিংবা আহত, অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে তিনি তাঁর সেবাশ্রমে এনে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করতেন। সুস্থ হয়ে উঠলে সেসব প্রাণীকে আবার তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করতেন অথবা প্রয়োজনে শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করতেন।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর উদ্ধার, চিকিৎসা, পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ হওয়ার পর তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার মহৎ কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন। প্রায় তিন দশক আগে তিনি ভাল্লুকের থাবায় তিনি তার একটি চোখ হারিয়েছিলেন।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং অসংখ্য বিরল ও বিপন্ন প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর অসামান্য অবদান, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর স্নেহ, মমতা, কর্মনিষ্ঠা এবং নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শ শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেই নয়, মানুষের হৃদয়েও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।