বাংলা গানের ইতিহাসে রক ও পপ সংগীতের কিংবদন্তী আজম খান এক অনন্য অধ্যায় । যিনি কেবল সুরের জাদুকর ছিলেন না, বরং গিটার হাতে এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন দ্রোহ ও ভালোবাসার নতুন এক শৈল্পিক ভাষা। আজ ৫ জুন পপসম্রাট আজম খানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালের এই দিনে তিনি পার্থিব মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ।

তবে ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’ কিংবা ‘অনামিকা’র মতো কালজয়ী গানগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন এ দেশের কোটি শ্রোতার হৃদয়ে।

আজিমপুরের ১০ নম্বর কলোনিতে জন্ম নেওয়া আজম খানের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে আজিমপুর ও কমলাপুরে। খুব ছোটবেলাতেই তার সংবেদনশীল মনে গভীর দোলা দিয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের অবিনাশী চেতনা। মাতৃভাষার দাবিতে মানুষের উত্তাল গণজমায়েত আর ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানগুলো শুনতে শুনতে বড় হয়েছেন তিনি। চারপাশের সেই প্রতিবাদী সুরই তাকে পরবর্তী সময়ে সাধারণ সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে এক বিপ্লবী সুরের পথে টেনে আনে।

আজম খানের কর্মজীবনের শুরু প্রকৃতপক্ষে ষাটের দশকের শুরুতে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড গঠন করেন। তার ব্যান্ড উচ্চারণ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভ্রাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সংগীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকালিস্ট করে অনুষ্ঠান করেছেন।

১৯৭২ সালে বিটিভিতে সেই অনুষ্ঠানের এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে ও চার কালেমা সাক্ষী দেবে গান দুটি সরাসরি প্রচারিত হলে ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা পান এই গানের দল। তার পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তীকালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে।

একসাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা। এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিড-রক ঘরানার গান জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে! তিনি দাবি করেন, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক। ‘এক যুগ’ নামে তার প্রথম অডিও অ্যালবাম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে।

১৭টি একক, ডুয়েট ও মিশ্রসহ সব মিলিয়ে তার গানের অ্যালবাম ২৫টি। তার প্রথম সিডি বের হয় ১৯৯৯ সালের ৩ মে ডিস্কো রেকর্ডিংয়ের প্রযোজনায়। আজমের উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে আছে দিদি মা, বাংলাদেশ, কেউ নাই আমার, অনামিকা, কিছু চাওয়া, নীল নয়নতা ইত্যাদি। মৃত্যুর পর ২০১১ সালে ইম্প্রেস অডিও ভিশনের ব্যানারে ‘গুরু তোমায় সালাম’ নামে তার সর্বশেষ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়