কলাপাড়ায় একসময় বাঁশ আর বেত দিয়ে তৈরি আসবাবপত্রই ছিল ঘরের জিনিসপত্র রাখার ভরসা। গোলাভরা ধান যে পাত্রে রাখা হত সেই গোলা তৈরি হতো বাঁশ-বেত দিয়ে। কিন্তু অধুনিক যুগে প্লাস্টিকের দাপট ও সহজলভ্যতায় বাজার দখল হওয়ায় এসবের ব্যবহার আর এর কারিগরদের দেখা মেলেনা। যাও আছে তা হাতেগোনা কয়েকজন। পুঁজি এবং ক্রেতার অভাবে হারাতে বসছে এগুলোর ব্যবহার। এরফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে কালের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতের তৈরি আসবাবপত্র। পেশা ছেড়ে দিয়েছে অনেকেই, যারা ধরে রেখেছে তাও নগন্য, দিন চলে কোন রকমে।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, একটা সময় গ্রামের প্রতিটি ঘরে ছিল বাঁশ আর বেতের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন আসবাবপত্র। ধান মাপার পালা, ধামা সের, গোলা, কুলা, চালনি, পানডালা, ধানের গোলা, নানা রঙ্গের চটই, ছোট ছোট পাটি, খেলনা, গরুর ঠুসি, কলমদানি, কাস্তের ঠোঙ্গা, বাঁশি, ফুলদানি, তরকারির ঢাকনা, চাল মাপার পুরাসহ নানান রকমের আসবাব।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ আর বেতের তৈরী জিনিসপত্র দেখা মেলেনা এখন আর তেমনটা। আধুনিক সময়ে এসবের ব্যবহার নাই বললেই চলে। এখন উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে। আগে গ্রামের বাড়িতে প্রায়শই দেখা মিলতো বাঁশ আর বেতের। এগুলো এখন আর চোখেও তেমন পড়েনা। বাঁশের দেখা কিছুটা মিললেও বেত মিলছে না। একদিকে ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়েছে গ্রামের বাসিন্দারা তেমনি কারিগরদের মজুরি, বাঁশ-বেতের অভাবে এ পেশা বিলুপ্তির পথে।
দুই যুগ ধরে ধরে কুটির শিল্পের সাথে জড়িত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামের পুলিন ব্যাপারি বলেন, একটা সময় খুব বিক্রি-বাট্টা ভালো ছিল। উৎপাদন খরচ ও কাঁচা মালের দাম কম থাকার পাশাপাশি মানুষের চাহিদাও ছিল বেশ। সব মিলিয়ে ভালোই চলত। একটা মাঝারী ধরনের ডোলা বানাতে সময় লাগে এক দুপুর। এখানে কাঁচা মাল আর সময় মিলিয়ে যেটা ব্যয় হয় সেটা কাঙ্খিত টাকায় বিক্রি করতে পারিনা। আগে ডেইলি ১০টা ডোলা বিক্রি হত। এখন সপ্তাহে ১০টা বিক্রি হয়না। এখন কাঁচা মালের অভাব আর উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এ শিল্প একেবারে শেষের পথে। লোকজনের চাহিদাও কম। সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দিলে ভালো হত।

মহিপুরের মনোহরপুরের অনিল চন্দ্র ব্যাপারী জানায়, কুটির শিল্পের সাথে জড়িত ছিলাম প্রায় দুই যুগ। এ পেশাকে বংশ পরম্পরায় নিয়েছিলাম আপন করেই কিন্তু ছেড়ে দিতে হয়েছে এ পেশা। আমার বাবার হাত ধরে শিখেছিলাম এ কাজ। কিন্তু বাঁশ-বেত না পাওয়া, শ্রম অনুযায়ী অর্থ না পাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি হওয়াসহ নানা সমস্যার কারনে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছি।
কুয়াকাটার মিশ্রীপাড়ার সুনিল চন্দ্র ব্যাপারী জানান, এখন এগুলো আগের মতো চলে না। পরিবর্তন বইছে এ জগতে। আমরা উন্নত প্রশিক্ষণ পাইনা। এখন গ্রামে কোন বাঁশ ঝাড় নাই। আনতে হয় বাহির থেকে ১ টাকার মাল ৭ টাকা দিয়ে। শ্রম দিয়া সঠিক মূল্য পাইনা। ছেলে-মেয়ে-বৌ এদের নিয়ে সংসার চলেনা। মনে কষ্ট নিয়েই এ পেশাকে বিদায় দিয়েছি। তবে যারা এখনো ধরে রেখেছে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে যুগের সাথে চলতে সহজ শর্তে ঋণ দিলে টিকে থাকতো এ পেশা।
নূরজাহান লাইভস্টক এন্ড হ্যাচারীর স্বত্বাধিকারী মো. নাইম জানায়, একসময় গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে বাঁশ আর বেতের ঝাড় ছিল। এখন এসবের দেখাই মেলেনা। ব্যবহারের ক্ষেত্র ছিল বহু। গাছে বেড়া দেওয়া থেকে শুরু করে ঘরের আসবাবপত্র। সব জায়গায় ছিল বাঁশ আর বেতের ব্যবহার। এখন বন জঙ্গল উজারের পাশাপাশি আধুনিকতার ছোয়া না দেওয়ায় ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প একেবারে শেষের পথে।
পটুয়াখালী জেলার বিসিক কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আলমগীর সিকদার বলেন, বিভিন্ন সেক্টরেই আধুনিকতার ছোয়া পেয়েছে। কুটির শিল্পের নানা জিনিসপত্র এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। যে পরিমাণে চাহিদা রয়েছে সে পরিমান আমরা রপ্তানি করতে পারছি না। আমরা বছরে ২থেকে ৩বার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। তারা আসলে আমরা উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি। পেশায় ভ্যারিয়েশন আনতে হবে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভালো বিক্রি হয়৷ তবে অনেকে নতুনত্ব না আনায় বাজারে টিকতে না পেরে ছিটকে পড়ছে। আমরা সবসময়ই চেষ্টা করি কুটির শিল্পীদের সহজশর্তে ঋণ দেয়ার, যা সবসময় অব্যহত থাকে।
মন্তব্য করুন